তোয়ালে আগলে শিরোপা, সেনেগালের নীরব নায়ক ইয়েভান দিওফ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৪ বার
তোয়ালে আগলে শিরোপা, সেনেগালের নীরব নায়ক ইয়েভান দিওফ

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফুটবলে নায়ক মানেই গোলদাতা বা শেষ মুহূর্তের বাঁচানো সেভ—এই ধারণাটাই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। কিন্তু আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের এবারের ফাইনাল যেন নতুন করে দেখিয়ে দিল, দলের জয়ের নায়ক হতে মাঠে নামতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কখনো কখনো মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে, চোখে না পড়া এক দায়িত্ব পালন করেও ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠা যায়। ঠিক এমনই এক ব্যতিক্রমী গল্পের জন্ম দিয়েছেন সেনেগালের রিজার্ভ গোলকিপার ইয়েভান দিওফ।

মরক্কোর রাবাতে গত রোববার রাতে অনুষ্ঠিত আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের নাটকীয় ফাইনালে দিওফের নাম ম্যাচ শিটে থাকলেও মাঠে নামার সুযোগ হয়নি। কিন্তু ম্যাচের ১২০ মিনিটজুড়ে তাঁর উপস্থিতি ছিল অবিচ্ছিন্ন। বৃষ্টিভেজা সেই উত্তেজনাপূর্ণ রাতে সেনেগালের শিরোপা জয়ের পেছনে তাঁর অবদান ছিল অন্য রকম, নীরব কিন্তু ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার আফ্রিকার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পথে সেনেগাল যখন ইতিহাস গড়ছে, তখন মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে সতীর্থের তোয়ালে রক্ষা করেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন ইয়েভান দিওফ।

ফাইনালের শুরু থেকেই রাবাতের আকাশ ছিল মেঘলা। ম্যাচের মাঝপথে শুরু হয় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, যা ধীরে ধীরে রূপ নেয় ভারী বৃষ্টিতে। এমন পরিস্থিতিতে গোলকিপারদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় গ্লাভস শুকনো রাখা। সেনেগালের প্রথম পছন্দের গোলকিপার, সাবেক চেলসি তারকা এদুয়ার্দ মেন্দির ক্ষেত্রেও বিষয়টি ব্যতিক্রম ছিল না। প্রতিটি আক্রমণের ফাঁকে ফাঁকে তাঁকে গ্লাভস মুছতে হচ্ছিল, যাতে বল ধরতে কোনো সমস্যা না হয়।

কিন্তু এখানেই শুরু হয় অদ্ভুত এক নাটক। ম্যাচ চলাকালে বারবার দেখা যায়, মেন্দির জন্য রাখা তোয়ালেটি সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন মরক্কোর খেলোয়াড়েরা। শুধু ফাইনালেই নয়, এর আগের সেমিফাইনালে নাইজেরিয়ার বিপক্ষেও একই কৌশল ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছিল তাদের। ফুটবলের নিয়মে তোয়ালে ব্যবহার নিষিদ্ধ নয়, তবু এমন আচরণ নিয়ে মাঠে বাড়তে থাকে উত্তেজনা।

এই পরিস্থিতিতেই দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন ইয়েভান দিওফ। রিজার্ভ বেঞ্চে বসে থাকা এই গোলকিপার যেন মুহূর্তের মধ্যেই বুঝে ফেলেন, দলের জন্য এখন তাঁর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কী। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, যেভাবেই হোক মেন্দির তোয়ালেটি নিরাপদ রাখতে হবে। এরপর শুরু হয় এক অদ্ভুত লড়াই—গোলপোস্টের সামনে নয়, বরং সাইডলাইনে।

পুরো ম্যাচজুড়ে, এমনকি অতিরিক্ত সময়ের ১২০ মিনিট পর্যন্ত দিওফকে দেখা গেছে বলবয় ও পতাকাবাহকদের কাছ থেকে তোয়ালেটি আগলে রাখতে। কখনো হাতে, কখনো শরীরের আড়ালে, আবার কখনো দৌড়ে সরে গিয়ে তিনি চেষ্টা করেছেন তোয়ালেটিকে প্রতিপক্ষের হাত থেকে দূরে রাখতে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে তিনজন বলবয় একসঙ্গে ধস্তাধস্তি করে দিওফকে মাটিতে ফেলে দেন। সেই দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরও দিওফ তোয়ালেটি ছাড়েননি। বরং উঠে দাঁড়িয়ে আবার দৌড়ে পালাচ্ছেন, যেন এটি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ট্রফি। ম্যাচের শেষ ভাগে মরক্কোর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমিকে সেনেগালের একটি তোয়ালে বিজ্ঞাপন বোর্ডের ওপারে ছুড়ে ফেলতেও দেখা যায়। পুরো ঘটনাটি ফাইনালের নাটকীয়তায় যোগ করে ভিন্ন এক মাত্রা।

শেষ পর্যন্ত সেনেগাল জয় পাওয়ার পর দিওফ নিজেও বিষয়টিকে হালকা রসিকতার চোখে দেখেন। ম্যাচ শেষে নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে জয়ের পদক আর সেই আলোচিত তোয়ালের ছবি পোস্ট করে তিনি লেখেন, ‘এই তো পদক আর তোয়ালে।’ একটি সাধারণ বাক্য, কিন্তু এর ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক অসাধারণ গল্প—দলের জন্য নিজের ভূমিকা পালনের আত্মতৃপ্তি।

ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ইয়েভান দিওফ বলেন, প্রতিপক্ষ দল কেন তোয়ালে নিয়ে এতটা বাড়াবাড়ি করেছে, তা তিনি নিজেও পুরোপুরি বুঝতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, ‘হয়তো মানুষ তোয়ালেগুলো নিয়ে অন্য কিছু ভেবেছে। কিন্তু আসলে বৃষ্টির মধ্যে শুধু গ্লাভস আর মুখ মুছতেই এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছিল। আমিও আপনাদের মতোই বিস্মিত হয়েছিলাম। তবে দল হিসেবে আমরা একসঙ্গে ছিলাম, আর এদুয়ার্দ প্রয়োজনের সময় তোয়ালেগুলো পেয়েছে।’ দিওফের এই বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিষয়টি তাঁর কাছে ব্যক্তিগত কোনো কীর্তি নয়, বরং দলের স্বার্থে নেওয়া একটি সাধারণ দায়িত্ব।

ফাইনালের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিওফের প্রশংসায় ভেসে যায় ফুটবলপ্রেমীদের টাইমলাইন। বিশেষ করে এক্সে একজন সমর্থকের লেখা মন্তব্য বেশ আলোচনায় আসে। সেখানে লেখা হয়, ‘ইয়েভান দিওফের কাজটা দেখুন, বন্ধুরা। পুরো একটা দেশের সম্মান তুমি অর্জন করেছ। সোলজার।’ এই একটি শব্দেই যেন ফুটে ওঠে দিওফের মানসিকতা—তিনি ছিলেন একজন সৈনিক, যিনি নিজের অবস্থান থেকে দলকে রক্ষা করেছেন।

তোয়ালে নিয়ে টানাটানির সেই উত্তেজনাপূর্ণ রাতেই মাঠের ভেতরে চলছিল আরেক নাটক। নির্ধারিত সময় গোলশূন্য থাকার পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের চতুর্থ মিনিটে একক নৈপুণ্যে অসাধারণ এক গোল করেন সেনেগালের পাপে গেয়ে। এই গোলই শেষ পর্যন্ত সেনেগালকে এনে দেয় আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের দ্বিতীয় শিরোপা।

তবে সেই গোলের আগে ঘটে যায় আরও বড় নাটক। যোগ করা সময়ের শেষ দিকে একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তে মরক্কো পেনাল্টি পায়। রেফারির এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সেনেগালের কোচ পাপে থিয়াও খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে অচল। খেলোয়াড়দের তর্ক-বিতর্ক, রেফারির সঙ্গে আলোচনা আর দর্শকদের উত্তেজনায় খেলা বন্ধ থাকে প্রায় ১৭ মিনিট।

এই সংকটময় মুহূর্তে সেনেগালের অভিজ্ঞ তারকা, লিভারপুলের সাবেক স্ট্রাইকার সাদিও মানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি মাঠে থেকেই সতীর্থদের খেলা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। শেষ পর্যন্ত সেনেগালের খেলোয়াড়েরা মাঠে ফিরে এলে আবার খেলা শুরু হয়। কিন্তু সেই পেনাল্টিতে গোল করতে ব্যর্থ হন মরক্কোর দিয়াজ। এরপর অতিরিক্ত সময়ে পাপে গেয়ের গোল সেনেগালের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

এই পুরো গল্পে গোলদাতা পাপে গেয়ে, নেতা সাদিও মানে কিংবা গোলপোস্ট আগলে রাখা এদুয়ার্দ মেন্দি—সবাই নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন শিরোপা জয়ের ইতিহাসে। তবে এর পাশাপাশি ফুটবলপ্রেমীরা মনে রাখবেন ইয়েভান দিওফের নামও। কারণ তিনি প্রমাণ করেছেন, দলের জয়ের জন্য কখনো কখনো ছোট মনে হওয়া দায়িত্বই সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে। মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে সতীর্থের তোয়ালে আগলে রাখার মধ্য দিয়েই তিনি হয়ে উঠেছেন সেনেগালের আরেক নীরব শিরোপা নায়ক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত