প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকার অন্যতম বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি) চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ কয়েক দিন ধরে শিক্ষার্থী আন্দোলন, শিক্ষক বহিষ্কার এবং ক্যাম্পাসজুড়ে অস্থিরতার পর শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, যা বিশ্ববিদ্যালয়টির সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সোমবার রাত ১৯ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের সই করা এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে ক্লাস বন্ধের বিষয়টি জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করা অনুকূল নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ইউএপির সব ক্লাস স্থগিত থাকবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেসিক সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের দুই শিক্ষকের বহিষ্কারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। গত রোববার ১৮ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের টানা বিক্ষোভ ও দাবির মুখে ওই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীরকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তার বিরুদ্ধে হিজাব ও নিকাব পরা নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য, মুসলিম শিক্ষার্থীদের হেনস্তা এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগ ওঠে।
একই দিনে আওয়ামী রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বেসিক সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. এ. এস. এম. মহসিনকেও বহিষ্কার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ক্যাম্পাসে নিরপেক্ষ ও নিরাপদ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে দুই শিক্ষককে বহিষ্কারের পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত আসে।
এর আগে শিক্ষক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগমুহূর্তে শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজেদের অভিযোগ ও অবস্থান তুলে ধরেন। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করে আসছিলেন। তারা জানান, হিজাব ও নিকাব পরার কারণে ক্লাস চলাকালে প্রকাশ্যে অপমান করা, ধর্মীয় বিধান নিয়ে কটূক্তি, মানসিক চাপ সৃষ্টি এবং ইসলামি মূল্যবোধকে অবজ্ঞা করার মতো আচরণ করেছেন ওই শিক্ষক।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগে আরও বলা হয়, নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া, নিকাব খুলতে চাপ সৃষ্টি করা এবং পরীক্ষার ফলাফলে পক্ষপাতমূলক গ্রেডিংয়ের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার ভিডিও ও অন্যান্য প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের আচরণ শুধু শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে না, বরং শিক্ষার্থীদের মানসিক নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলে।
এই অভিযোগগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অনেক শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সামাজিক সংগঠন বিষয়টিকে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে দেখেন। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করে এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে শিক্ষক বহিষ্কারের পরও ক্যাম্পাসে উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রশাসনের কাছে আরও কিছু দাবি তুলে ধরে, যার মধ্যে নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা, ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রশাসনের নিয়মিত সংলাপের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই অবস্থায় কর্তৃপক্ষ মনে করে, আপাতত একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়াই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ক্লাস বন্ধ থাকলেও প্রশাসনিক পর্যায়ে যোগাযোগ ও আলোচনার কাজ চলবে। শিক্ষার্থী প্রতিনিধি, শিক্ষক প্রতিনিধি এবং ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হলে দ্রুতই ক্লাস ও অন্যান্য কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা সম্ভব হবে।
শিক্ষা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই ঘটনা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার পরিবেশ, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের বিষয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞানচর্চার স্থান নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চার ক্ষেত্রও বটে। তাই যেকোনো ধরনের বৈষম্য বা অবমাননাকর আচরণের বিরুদ্ধে দ্রুত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বন্ধ থাকায় সেমিস্টার, পরীক্ষা ও একাডেমিক ক্যালেন্ডার নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। অনেক শিক্ষার্থী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাস বন্ধ থাকলে তাদের শিক্ষা জীবন বিলম্বিত হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা আশা করছেন, এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেছে এবং একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
সব মিলিয়ে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে ক্লাস বন্ধের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি প্রশাসনিক ঘোষণা নয়, বরং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মূল্যবোধ, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে একটি বড় বার্তা বহন করছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কীভাবে এই সংকট সামাল দেয়, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট সবার।