নির্বাচনের আগে বরিশালে নদীপথে অস্ত্র প্রবাহে জনদুর্ভোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৩ বার
বরিশাল নির্বাচন আগে অস্ত্র প্রবাহ

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বরিশাল শহরের নাগরিকদের মধ্যে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে আতঙ্ক বাড়ছে। শহরের সড়ক ও নৌপথের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র প্রবাহের খবর স্থানীয়দের উদ্বেগের মাত্রা বৃদ্ধি করেছে। আধিপত্য বিস্তার, মাদক, ছিনতাই ও নির্বাচনী প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে এই অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে বলে এলাকাবাসী জানাচ্ছেন। রাতে বা দিনের যে কোনো সময় প্রকাশ্যে অস্ত্র চালানো হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষকে ভীত ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফেলেছে।

স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় ট্রলার ও ছোট নৌযান ব্যবহার করে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ঢুকানো হচ্ছে। মোহাম্মদপুর, রসুলপুর ও পলাশপুর এলাকায় বিশেষভাবে এই ধরনের কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করা গেছে। রিপন নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, রাতের শেষ দিকে লবণবোঝাই ও মাছের ট্রলারে পিস্তল, দা ও মাদকসহ সামগ্রী নিয়ে আসা হয়। পরে তা মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিতরণ করা হয়। তিনি বলেন, “একটি সংগঠিত চক্র এই সরবরাহ কার্যক্রম চালাচ্ছে। লোকেরা ভীত হয়ে ঘরে থাকে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হচ্ছে।”

শহরের বেলতলা খেয়াঘাট এলাকার ষাটোর্ধ্ব হারিছ উদ্দিনও বলেন, সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত নদীর তীরে বিভিন্ন ধরনের ট্রলারের আনাগোনা এবং মাদক কেনাবেচা লক্ষ্য করা যায়। “আমরা জানি যে এসব ট্রলার কখনও কখনও অস্ত্র ও বিপজ্জনক সামগ্রী বহন করে। সাধারণ মানুষ নিরাপদে চলাফেরা করতে পারছে না,” তিনি অভিযোগ করেন।

প্রকাশ্য ঘটনা থেকে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চলতি মাসের ৫ তারিখে নগরের বিসিক এলাকার আকবর নামের এক ব্যক্তি আলমারি মেরামতের জন্য জাকির হোসেনের কাছে আলমারি গ্রহণ করেন। মেরামতের সময় আলমারির ভেতর সাত রাউন্ড গুলি পাওয়া যায়। পরে আকবর তা উদ্ধার করে কাউনিয়া থানা পুলিশের কাছে জমা দেন। পুলিশ জানায়, গুলির কোনো বৈধ কাগজপত্র ছিল না। জাকিরকে আটক করা হয় এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

এর আগে গত ১৭ ডিসেম্বর রাতে বরিশাল মহানগরীর রিফিউজি কলোনীতে দুই পক্ষের আধিপত্য প্রদর্শনের সময় অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে এক পক্ষ দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে, যা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা জানান, শহরে দুইটি পক্ষ মাদক ও ছিনতাইয়ের সিন্ডিকেট চালায়। নিজেদের রক্ষার জন্য তারা প্রায়শই অস্ত্র মহড়া দেয় এবং স্থানীয়দের ভীত রাখে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশাল মহানগরের সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশের বিভিন্ন থানার কাছ থেকে চব্বিশের ৫ আগস্ট পর্যন্ত যে অস্ত্র লুট হয়েছে তার একটি বড় অংশ এখনও উদ্ধার হয়নি। তিনি বলেন, “প্রতিটি নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর থাকে। কিন্তু এবার নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন বাকি থাকায় এ ধরনের তৎপরতা যথেষ্ট দৃশ্যমান নয়, যা নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে।”

অন্যদিকে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, মহানগরী এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। উপ-পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মো. আব্দুল হান্নান বলেন, “বরিশালের কোনো থানায় অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটেনি। মহানগরীর চার থানা এলাকার যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা মোকাবেলায় আমরা প্রস্তুত। স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার।”

তবে স্থানীয়রা মনে করছেন, সড়কপথ ছাড়াও নৌপথে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি সরকার ও পুলিশ পর্যবেক্ষণ করতে পারলে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। শহরের কিছু বাসিন্দা জানান, নদীর তীরবর্তী এলাকায় রাতের বেলা সন্দেহজনক ট্রলারের চলাচল ও সামগ্রী আনাগোনা বেড়েছে। এতে স্থানীয়রা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং বিশেষ করে নির্বাচনী সময় শহরের অবাধ পরিবেশ সৃষ্টির জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ সাধারণত রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বরিশালের মতো নগরীতে অবৈধ অস্ত্রের বেড়ে চলা প্রবণতা সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করছে এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নদীপথ ব্যবহার করে অস্ত্র পরিবহন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

স্থানীয় প্রশাসন অবশ্য জানায়, নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। নদীপথে চেকপোস্ট স্থাপন, ট্রলার ও নৌযান তল্লাশির মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। তবে স্থানীয়দের মতে, এই ধরনের অভিযান দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে হলে নিয়মিত নজরদারি, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণ জরুরি।

নির্বাচনপ্রসঙ্গিক এই অবৈধ অস্ত্র পরিস্থিতি শুধু বরিশাল নয়, দেশের অন্যান্য নগরীতেও নির্বাচনী উত্তেজনা বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অবৈধ অস্ত্রের সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে নির্বাচনের সময় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

নাগরিকদের উদ্বেগ, নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রম এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে নির্বাচনের আগে বরিশালের পরিস্থিতি ক্রমেই নজরকাড়া হয়ে উঠছে। শহরের বাসিন্দারা আশা করছেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং নদীপথে অস্ত্র প্রবাহ বন্ধ করবে। যাতে ভোটগ্রহণ ও নির্বাচনী কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক ও নিরাপদ পরিবেশে সম্পন্ন হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত