ফয়জুল করিমের সম্মানে বরিশালে প্রার্থীতা ছাড়ল জামায়াতে ইসলামী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৫ বার
ফয়জুল করিমের সম্মানে বরিশালে প্রার্থীতা ছাড়ল জামায়াতে ইসলামী

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন প্রতিযোগিতা ও কৌশল নির্ধারণের ব্যস্ততা তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়ে বরিশালের রাজনীতিতে একটি ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলো জামায়াতে ইসলামী। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করিমের প্রতি সম্মান জানিয়ে বরিশাল-৫ (সদর) আসন থেকে নিজেদের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেছে দলটি। এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় রাজনীতিতে যেমন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি ইসলামী রাজনীতির ভেতরে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সমন্বয়ের এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবেও দেখছেন অনেকে।

মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) দুপুরে বরিশাল জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীতা প্রত্যাহারের আবেদন জমা দেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসেন হেলাল। দুপুর ২টার দিকে তিনি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন এবং বিষয়টি নিশ্চিত করেন নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই এই আবেদন জমা দেওয়ায় আইনগত দিক থেকেও প্রার্থীতা প্রত্যাহারে কোনো জটিলতা থাকছে না বলে জানিয়েছে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়।

প্রার্থীতা প্রত্যাহারের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসেন হেলাল বলেন, এই সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিগত বা স্থানীয় চাপের ফল নয়; বরং এটি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সুস্পষ্ট নির্দেশনার অংশ। তাঁর ভাষায়, “কেন্দ্রীয় নির্দেশে চরমোনাইয়ের সম্মানে আমরা বরিশাল-৫ আসন থেকে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেছি।” তিনি আরও বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করিম ইসলামী রাজনীতিতে একটি সম্মানিত নাম, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ঐক্যের স্বার্থেই এই ত্যাগ স্বীকার করেছে জামায়াতে ইসলামী।

এই সিদ্ধান্তের পেছনের দার্শনিক ও রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুয়াযযম হোসেন হেলাল বলেন, জামায়াতে ইসলামী কেবল ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। তাঁর মতে, “আমরা সকলে মিলে একটি ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে প্রত্যেকে স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারবে। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন হলে আমাদের ছোট ছোট ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, অতীতে ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে জামায়াতে ইসলামী ও এর নেতাকর্মীদের ওপর যে নির্যাতন নেমে এসেছে, তার তুলনায় একটি আসনে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করা খুব বড় কিছু নয়। “আমরা জেল-জুলুম, মামলা-হামলা সহ্য করেছি। সেখানে একটি আসন ছেড়ে দেওয়া কোনো বিষয়ই না। এই ছোট ত্যাগের মধ্য দিয়েই ভবিষ্যতের একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে”—বলেছেন তিনি।

বরিশাল জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত বরিশাল জেলার মোট তিনটি আসন থেকে চারজন প্রার্থী তাঁদের প্রার্থীতা প্রত্যাহারের আবেদন জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর এই সিদ্ধান্তটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, কারণ এটি কেবল একটি নির্বাচনকেন্দ্রিক কৌশল নয়, বরং রাজনৈতিক সৌজন্য ও পারস্পরিক সম্মানের বার্তা বহন করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং জামায়াতে ইসলামী—এই দুই দলের ভোটব্যাংকে অনেক ক্ষেত্রেই মিল রয়েছে। একই আসনে উভয় দল প্রার্থী দিলে ভোট বিভাজনের আশঙ্কা থাকে, যা শেষ পর্যন্ত ইসলামী ঘরানার রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সেই বিবেচনায় বরিশাল-৫ আসনে জামায়াতের প্রার্থীতা প্রত্যাহারকে একটি কৌশলগত ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হিসেবেও দেখছেন অনেকে। এতে করে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি ফয়জুল করিমের জন্য পথ কিছুটা হলেও সহজ হলো বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

উল্লেখ্য, এর আগেই গত রোববার (১৮ জানুয়ারি) ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করিমের নির্বাচনী আসনে কোনো প্রার্থী না দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। সেই সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রতিফলন হিসেবেই মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করা হলো। এতে বোঝা যায়, বিষয়টি হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং আগেই আলোচনার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এটি চূড়ান্ত করা হয়েছিল।

বরিশাল-৫ আসনটি বরাবরই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিভিন্ন সময় নানা দলের প্রভাব থাকলেও ইসলামী ঘরানার রাজনীতির একটি শক্ত অবস্থান রয়েছে। ফলে এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী না থাকাটা নির্বাচনী সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলেই মনে করা হচ্ছে। স্থানীয় ভোটারদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে কৌতূহল দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ এটিকে ইতিবাচক ঐক্যের নিদর্শন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের অংশ বলেও মন্তব্য করছেন।

তবে জামায়াতে ইসলামী নেতারা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য ক্ষমতা নয়, বরং একটি আদর্শিক রাষ্ট্র গঠনের পথ সুগম করা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামী শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজন নয়, বরং ঐক্যই সময়ের দাবি। আর সেই ঐক্যের স্বার্থে যদি কোনো আসনে ছাড় দিতে হয়, সেটিকে তারা আত্মত্যাগ হিসেবেই দেখেন।

সব মিলিয়ে বরিশাল-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীতা প্রত্যাহার শুধু একটি নির্বাচনী খবর নয়; এটি বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির ভেতরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমঝোতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। নির্বাচনের বাকি দিনগুলোতে এই সিদ্ধান্ত কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত