প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই আস্থার সংকট, তারল্য ঘাটতি ও বিনিয়োগ স্থবিরতার যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তার মূল কারণ হিসেবে আবারও উঠে এসেছে ভালো ও মানসম্পন্ন কোম্পানির অভাব। দেশীয় ও বিদেশি—উভয় ধরনের বড় বিনিয়োগকারীদের মতে, বাজারে বিনিয়োগযোগ্য শক্ত ভিত্তির কোম্পানির সংখ্যা খুবই সীমিত। ফলে বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিয়ে তারা আগ্রহ হারাচ্ছেন। এমন বাস্তবতায় শেয়ারবাজার পুনরুদ্ধারের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বাজারের ব্যাপ্তি ও গভীরতা বাড়ানো।
রাজধানীর বনানীর একটি অভিজাত হোটেলে ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের উদ্যোগে আয়োজিত ‘নির্বাচন–পরবর্তী অর্থনীতি, রাজনীতি ও পুঁজিবাজার’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব মতামত তুলে ধরেন। দেশীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতিতে সেমিনারটি পরিণত হয় নির্বাচন-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা মঞ্চে।
সেমিনারের অতিথি আলোচক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গত দেড় বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি নিম্নস্তরের ভারসাম্যে আটকে পড়েছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন ব্যাপক সংস্কার, উদারীকরণ এবং বাজারমুখী নীতির বাস্তব প্রয়োগ। তিনি বলেন, ভিয়েতনাম ও চীন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কসংক্রান্ত নানা জটিলতায় পড়েছে, যেখানে তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশ এখনো সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—বিদেশিরা বাংলাদেশে আসছেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন, কিন্তু বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। কারণ তারা একটি গ্রহণযোগ্য ও স্থিতিশীল নির্বাচনের অপেক্ষায় আছেন। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগের দ্বার খুলে যেতে পারে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মূল প্রবন্ধে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা র্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, আগামী সরকারের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ জোরদার করা এবং বিনিয়োগবান্ধব সংস্কার নিয়ে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই স্পষ্ট বার্তা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে তথ্যের মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানো না গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে না। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে কারও সন্দেহ নেই। কিন্তু স্বল্পমেয়াদি সংকট দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যত দ্রুত বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যাবে, তত দ্রুত অর্থনীতি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।
প্যানেল আলোচনায় ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, সুদের হার, বৈদেশিক মুদ্রা, পণ্যবাজার ও পুঁজিবাজার—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের মধ্যে পুঁজিবাজারেই বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে। তাঁর ভাষায়, এই বাজারে আস্থা কম, তারল্য সংকট প্রকট এবং ভালো শেয়ারের সংখ্যাও খুব সীমিত। ছয় বা সাতটির বেশি মানসম্পন্ন শেয়ার উল্লেখ করা কঠিন। তিনি বলেন, বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যেমন জেপি মরগ্যান ইতোমধ্যে ভালো ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কাজ করছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত। তবে অধিকাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করছে।
সেমিনারে অনলাইনে যুক্ত হয়ে সুইডেনভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান টুন্ড্রা ফন্ডারের প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার ম্যাটিয়াস মার্টিনসন বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য উদীয়মান বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এখনও কয়েক বছর পিছিয়ে রয়েছে। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার বাজারের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, বাজার কাঠামো, গভীরতা ও বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানির দিক থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। তাঁর মতে, শেয়ারবাজার পুনরুদ্ধারের প্রথম ধাপ হতে হবে বাজারের বিস্তৃতি বাড়ানো এবং ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং বাজারে গুণগত পরিবর্তন আসবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কনটেক্সচুয়াল ইনভেস্টমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকাও হিরোসে অনলাইনে যুক্ত হয়ে বলেন, বাংলাদেশে নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময় সাধারণত কিছুটা অস্থির থাকে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের আগে নিশ্চিত হতে চান যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রয়েছে। তিনি বলেন, এই নিশ্চয়তা পাওয়া গেলে বাংলাদেশের বাজারে বিনিয়োগের বিষয়ে তারা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরির মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য। সে কারণেই আর্থিক প্রতিবেদন ও তথ্য প্রকাশের মান নিশ্চিত করতে বিধিমালা এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে নিম্নমানের বা অসাধু অংশগ্রহণকারীদের ছাড় দেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকে। তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসইসি বাজারে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
সেমিনারে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল আতিকুর রহমানের কাছে প্রশ্ন করা হয়, তাঁর দল ভবিষ্যতে সরকার গঠন করলে শরিয়াহভিত্তিক অর্থনীতিতে যাওয়ার জন্য হঠাৎ কোনো পরিবর্তন আসবে কি না। জবাবে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী ন্যায়বিচার, নৈতিক শাসনব্যবস্থা ও মানবকল্যাণের দর্শনে বিশ্বাসী। তবে এর অর্থ এই নয় যে হঠাৎ করে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হবে। বাস্তববাদী ও ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার পক্ষেই তাদের অবস্থান।
সব মিলিয়ে সেমিনারের আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, দেশের শেয়ারবাজারের বর্তমান সংকট কোনো একক সমস্যার ফল নয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতিগত সংস্কার, স্বচ্ছতা ও ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ—এই সবকিছুর সমন্বয় ছাড়া বাজারে আস্থা ফিরবে না। নির্বাচন-পরবর্তী সময়কে সামনে রেখে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর উদ্যোগই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার কত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।