বস্ত্রশিল্পের ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ গিলে খাচ্ছে ভারত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫১ বার
বাংলাদেশ বস্ত্রশিল্প সংকট ভারত

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্প দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। কোটি মানুষের কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস এবং শিল্পায়নের মেরুদণ্ড হিসেবে এই খাতের গুরুত্ব প্রশ্নাতীত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশীয় বস্ত্রশিল্প এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আজ অস্তিত্ব সংকটে, যার পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে প্রতিবেশী ভারত থেকে আগ্রাসী মূল্যে সুতা ও নিম্নমানের কাপড়ের আমদানি। এই পরিস্থিতি শুধু একটি শিল্পখাতের নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যই অশনিসংকেত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশীয় স্পিনিং মিল, উইভিং ও ডাইং-প্রিন্টিং কারখানাগুলো গত তিন বছরে যে চাপের মুখে পড়েছে, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) বলছে, ২০২২ সালের পর থেকে হঠাৎ করে সুতা ও কাপড় আমদানির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর বড় অংশই এসেছে ভারত থেকে। এক সময় যেখানে দেশীয় মিলগুলো স্থানীয় পোশাক শিল্পের বড় অংশের চাহিদা পূরণ করত, সেখানে এখন বাজার প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে উঠছে। এতে একদিকে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকে নেমে এসেছে, অন্যদিকে হাজার হাজার শ্রমিকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

ভারতীয় কটন টেক্সটাইল কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে ভারত থেকে সুতা রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪২৯ মিলিয়ন ডলার। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১.১১ বিলিয়ন ডলারে। আর ২০২৪ সালে এই অঙ্ক লাফিয়ে পৌঁছায় প্রায় ২ দশমিক ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। শুধু তুলাভিত্তিক সুতা নয়, এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সিন্থেটিক ও কৃত্রিম ফাইবার, এমএমএফ এবং অন্যান্য কাঁচামাল। সব মিলিয়ে মোট সুতা খাতে আমদানির পরিমাণ ছাড়িয়েছে ৩ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। বিটিএমএর দাবি, বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত মোট সুতার প্রায় ৯৫ শতাংশই ভারত থেকে আসছে, যা স্থানীয় শিল্পের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।

এই আমদানির বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘প্রাইস ডাম্পিং’। স্থানীয় মিলগুলোর উৎপাদন খরচ যেখানে প্রতি কেজি সুতায় প্রায় ২ দশমিক ৩৯ ডলার, সেখানে ভারতীয় সুতা বাজারে ঢুকছে ২ দশমিক ১৯ ডলার বা তারও কম দামে। এই দামের ব্যবধান স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতার বাইরে ঠেলে দিচ্ছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ বস্ত্র উৎপাদক প্রতিষ্ঠান জাবের অ্যান্ড জুবায়ের-এর শীর্ষ কর্মকর্তা সিফাত হোসেন ফাহিম জানিয়েছেন, ভারতীয় সুতা রপ্তানিকারকরা পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের বাজারকে লক্ষ্য করে সীমান্তবর্তী এলাকায় অন্তত অর্ধ শতাধিক ওয়্যারহাউস স্থাপন করেছেন। এসব গুদাম থেকে দ্রুত পণ্য সরবরাহের সুবিধায় তাদের লিডটাইম কমে গেছে, যা দেশীয় মিলগুলোর তুলনায় তাদের আরও সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে।

ভারত সরকারের ‘রিমিশন অব ডিউটিজ অ্যান্ড ট্যাক্সেস অন এক্সপোর্টেড প্রোডাক্টস’ স্কিমের আওতায় সুতা রপ্তানিতে তারা প্রতি কেজিতে প্রায় ৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ ভর্তুকি পাচ্ছেন। এই ভর্তুকি যোগ হয়ে ভারতীয় সুতার দাম আরও কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে পোশাক শিল্প মালিকরা স্বাভাবিকভাবেই সস্তা কাঁচামালের দিকে ঝুঁকছেন। স্বল্পমেয়াদে এতে পোশাক খাত কিছুটা স্বস্তি পেলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় বস্ত্রকল বন্ধ হয়ে গেলে রপ্তানি খাতের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্তমান সরকার ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট স্থলপথে ভারত থেকে সুতা আমদানি নিষিদ্ধ করে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে উদ্দেশ্য ছিল অবৈধ ও অতিরিক্ত আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় শিল্পকে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সমুদ্রপথে নিম্নমানের সুতা আমদানি আরও বেড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, স্থলবন্দরে যথাযথ তদারকির অভাবে ঘোষণার চেয়ে বেশি সুতা দেশে প্রবেশ করত এবং ঘোষিত কাউন্টের চেয়ে ভিন্ন মানের সুতা চালানে ঢুকিয়ে আনা হতো। এমনকি বন্ড সুবিধায় আমদানি করা সুতা স্থানীয় বাজারে কম দামে বিক্রি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা বড় মুনাফা করতেন, যার পুরো বোঝা বইতে হতো দেশীয় মিলগুলোকে।

বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের সুতাকলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সংগঠনটির সদস্য ৫২৭টি সুতাকল, ৯৯৪টি কাপড় উৎপাদন এবং ৩৪২টি ডাইং-প্রিন্টিং কারখানা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এই খাতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার হলেও গত তিন বছরে একটি নতুন বিনিয়োগও আসেনি। উল্টো অন্তত ৩০টির বেশি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে আরও বহু কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে তিনি সতর্ক করেন। সংকট মোকাবিলায় তিনি দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের দাবি জানিয়েছেন।

নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, সমস্যার একটি দিক হলো নীতিগত অসামঞ্জস্য। তার ভাষায়, স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ হওয়ায় সময় বাড়ছে এবং এতে পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে। তিনি বলেন, ভারতীয় সুতা এখনো বাংলাদেশের তুলনায় কেজিতে ২০ থেকে ৩০ সেন্ট সস্তা, আর দেশীয় সুতায় নগদ সহায়তা কমে যাওয়ায় এই ব্যবধান আরও বেড়েছে। তার মতে, একটি শিল্পকে রক্ষা করতে গিয়ে আরেকটি রপ্তানিমুখী শিল্পকে সংকটে ফেলা উচিত নয়। তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, দেশীয় বস্ত্রকলগুলোকে টিকে থাকতে হলে নিজস্ব কৌশল ও দক্ষতা বাড়াতে হবে।

ভারতীয় সুতার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ভারতের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে উৎপাদিত অনেক সুতা মানের দিক থেকে দুর্বল। এসব সুতায় উৎপাদিত কাপড় ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রায়ই পুরো চালান রিজেক্ট হচ্ছে। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট কারখানাই নয়, দেশের সামগ্রিক রপ্তানি সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্বল্পমেয়াদে সস্তা কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে মানহীন পণ্যের কারণে বাজার হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে।

এই সংকটের পেছনে নীতিগত সিদ্ধান্তের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, বিগত সরকারের সময় ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশীয় বস্ত্র খাতের জন্য দেওয়া প্রায় সব ধরনের ভর্তুকি বা সেইফগার্ড সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের যুক্তিতে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পরামর্শে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও শিল্প মালিকদের দাবি ছিল, একই সময়ে ভারতে ভর্তুকি বাড়ানো হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। বর্তমানে ক্ষেত্রবিশেষে মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ ভর্তুকি পাচ্ছেন উদ্যোক্তারা, যা কার্যত কোনো প্রণোদনাই নয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় নির্দিষ্ট কিছু সুতার শুল্কমুক্ত আমদানি বন্ধের সুপারিশ করেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে পাঠানো এই প্রস্তাবকে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, এতে অন্তত অসম প্রতিযোগিতা কিছুটা কমবে। তবে তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ আশঙ্কা করছে, এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দুই পক্ষের এই টানাপোড়েন দেখিয়ে দেয়, সংকটটি কতটা জটিল এবং সমন্বিত নীতির অভাব কতটা প্রকট।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় সুতা আমদানির পরিমাণ ৬৮ শতাংশের বেশি এবং মূল্য ৪৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে অন্তত ৫০টি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে। এই সংখ্যা যদি আরও বাড়ে, তাহলে শুধু বিনিয়োগই নয়, লাখো শ্রমিকের জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়বে। গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় গড়ে ওঠা এসব মিল বন্ধ হলে সামাজিক প্রভাবও হবে সুদূরপ্রসারী।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই সংকট শুধু বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার ফল নয়, বরং এটি আঞ্চলিক বাণিজ্য নীতি, ভর্তুকি কাঠামো এবং কূটনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ভারতের মতো বড় অর্থনীতি নিজেদের শিল্প রক্ষায় ভর্তুকি দিয়ে রপ্তানি বাড়াচ্ছে, আর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার পরামর্শে সেইফগার্ড তুলে নিচ্ছে—এই বৈষম্য স্থানীয় শিল্পকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তাই সমাধানও হতে হবে কৌশলগত ও সমন্বিত।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, একদিকে মানহীন ও ডাম্পিং দামে আমদানি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যদিকে দেশীয় মিলগুলোর দক্ষতা, প্রযুক্তি ও উৎপাদন খরচ কমাতে নীতি সহায়তা দিতে হবে। ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানো, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে স্থিতিশীলতা এবং গবেষণা ও মান উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও জোর দিচ্ছেন তারা। নইলে সাময়িক স্বস্তির বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদে দেশের বস্ত্রশিল্পের ভিত্তি ভেঙে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে বস্ত্র ও পোশাক শিল্প একটি সাফল্যের গল্প। সেই গল্প যাতে আগ্রাসী আমদানি ও নীতিগত অসামঞ্জস্যের কারণে থেমে না যায়, সে জন্য এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন উদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকেরা। অন্যথায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়বে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান ভরসাটিও।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত