প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় এক মানবিক মুহূর্তই পরিণত হলো মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে। সড়কের মাঝখানে থাকা এক ভবঘুরে নারীকে রক্ষা করতে গিয়ে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ফজলুল হক চুমকু (৫২) নামে এক বিএনপি নেতা। মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়া উপজেলার বাদামতল এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। মানবিকতার তাগিদে নেওয়া একটি মুহূর্তের সিদ্ধান্ত যে একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
নিহত ফজলুল হক চুমকু পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের মৃত আবুল হাশেমের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে কোনো আনুষ্ঠানিক পদে ছিলেন না। তবে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, তিনি ছিলেন একজন পরীক্ষিত ও ত্যাগী কর্মী, যিনি দলীয় সংকটে-সংগ্রামে সবসময় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। রাজনীতির পাশাপাশি এলাকায় সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তার সরব উপস্থিতি ছিল বলে স্থানীয়রা জানান।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার রাতে ফজলুল হক চুমকু নিজ মোটরসাইকেল চালিয়ে বন্ধু মুস্তফা মোরশেদকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির দিকে ফিরছিলেন। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের বাদামতল এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ সড়কের মাঝখানে এক ভবঘুরে নারীকে দেখতে পান তারা। দ্রুতগতির মহাসড়কে ওই নারী মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ছিলেন। মুহূর্তের মধ্যেই ফজলুল হক চুমকু তাকে বাঁচাতে মোটরসাইকেল ঘোরাতে গেলে যানটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের একটি গর্তে পড়ে উল্টে যায়।
দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেলে থাকা অপর আরোহী মুস্তফা মোরশেদ সামান্য আহত হলেও ফজলুল হক চুমকু বাহ্যিকভাবে তেমন কোনো আঘাত পাননি বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। স্থানীয়রা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে বাড়ির দিকে পাঠিয়ে দেন। শুরুতে বিষয়টিকে তেমন গুরুতর মনে হয়নি কারও। কিন্তু দুর্ঘটনার কিছু সময় পরেই পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে।
স্বজনদের ভাষ্যমতে, রাত আনুমানিক ৮টার দিকে বাড়ি ফেরার পর ফজলুল হক চুমকু হঠাৎ অসুস্থ বোধ করেন। তার বমি বমি ভাব শুরু হয় এবং শারীরিক অস্বস্তি বাড়তে থাকে। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। তবে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই রাত ৯টার দিকে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের মাঝে নেমে আসে শোকের ছায়া।
হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, মোটরসাইকেল উল্টে তিনি সামান্য আহত হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়েছিল। বাড়ি ফেরার পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। তিনি আরও বলেন, ফজলুল হক চুমকু কোনো পদে না থাকলেও দলের জন্য ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ একজন মানুষ। এলাকার রাজনীতিতে তার ভূমিকা সবাই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
স্থানীয় বিএনপি নেতারা জানান, ফজলুল হক চুমকু ছিলেন নীরব অথচ দৃঢ়চেতা একজন রাজনীতিক। দলীয় পদ-পদবির বাইরে থেকেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। আন্দোলন-সংগ্রামের সময় নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো, মানুষের বিপদে সহায়তা করা—এসব ছিল তার স্বভাবজাত গুণ। ভবঘুরে নারীকে বাঁচাতে গিয়ে জীবন হারানো তার মানবিক মানসিকতারই প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেন তারা।
ঘটনার পর থেকে এলাকায় শোকের আবহ বিরাজ করছে। নিহতের বাড়িতে ভিড় করছেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও রাজনৈতিক সহকর্মীরা। অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন তার এমন অকাল প্রস্থানে। স্থানীয়দের মতে, সড়কে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা একজন নারীকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করা নিঃসন্দেহে বিরল মানবিক দৃষ্টান্ত।
এদিকে এই দুর্ঘটনা আবারও মহাসড়কে পথচারীদের নিরাপত্তা এবং সড়কের অবকাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়টি সামনে এনেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সড়কের মাঝখানে গর্ত, অপর্যাপ্ত আলো এবং পথচারী পারাপারের নিরাপদ ব্যবস্থা না থাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। ভবঘুরে মানুষ ও মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিরা অনেক সময় মহাসড়কে অবস্থান করলেও তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না।
সচেতন মহল মনে করছেন, এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। বিশেষ করে রাতের বেলায় মহাসড়কে টহল জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সতর্ক সংকেত ও আলো স্থাপন এবং সড়কের মাঝখানে থাকা গর্ত দ্রুত সংস্কার করা জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় ভবঘুরে ও অসহায় মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার উদ্যোগ জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ফজলুল হক চুমকুর মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবারের নয়, পুরো এলাকার জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একজন মানবিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন মানুষের এমন আকস্মিক প্রস্থান সবাইকে নাড়া দিয়েছে। তার জীবনের শেষ মুহূর্তটিও যে মানবিক দায়িত্ববোধের উদাহরণ হয়ে থাকবে, তা অনেকের চোখে তাকে আরও মহিমান্বিত করে তুলেছে।
তার মৃত্যুতে বিএনপির স্থানীয় ইউনিটের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে। দলীয় নেতারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, ফজলুল হক চুমকুর ত্যাগ ও মানবিকতা নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দেয়, সড়ক শুধু যানবাহনের চলাচলের স্থান নয়, এটি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি মুহূর্তের অসতর্কতা বা অব্যবস্থাপনা কত বড় ট্র্যাজেডি ডেকে আনতে পারে, ফজলুল হক চুমকুর মৃত্যু তারই নির্মম উদাহরণ।