প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
১৯৪৭ সাল থেকে প্রায় আট দশক ধরে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার প্রভুত্ব কায়েমের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। কিন্তু রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সে তেমন সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। ২০১৪ সালের পর এক যুগ কট্টর হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদি একচ্ছত্র ক্ষমতায় বসে ঘরের পাশে প্রভুত্ব কায়েমে ব্যর্থ হলেও নিজেকে বিশ্বগুরু হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এই প্রচেষ্টা বিশ্বমঞ্চে বহু জায়গায় ঠাট্টা-মশকরা এবং সমালোচনার মুখে পড়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিতে মার্কিন নীতিতে আসা পরিবর্তনের পর ভারতীয় প্রভাব বিশ্ব ভূরাজনীতিতে কিছুটা ক্ষীণ হয়ে গেছে। তবে একটি ক্ষেত্রে ভারত সম্পূর্ণ সুপারপাওয়ার, সেটি হলো ক্রিকেট।
ভারতের জনগণ ক্রিকেটকে খেলা হিসেবে নয়, বরং ধর্মের আসনে বসিয়ে দিয়েছে। দেশটিতে টেন্ডুলকার, কোহলি কিংবা অন্যান্য ক্রিকেটাররা মানুষ নয়; তারা ভগবান। যেমন ভারতের জনগণ বলিউডের কল্পকাহিনিকেও ইতিহাস বলে বিশ্বাস করে। সিনেমা আর ক্রিকেট নিয়ে কোটি কোটি মানুষ মেতে থাকে। এই সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আবেগ ভারতের ক্রিকেটকে বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি দিয়েছে। আইপিএল এবং অন্যান্য ক্রিকেট লিগের সময় জুয়ার বাজার ও বিজ্ঞাপনের আকার বিশাল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা আইসিসি এখন নামেই আন্তর্জাতিক, বাস্তবে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রভাবেই পরিচালিত। আইসিসির প্রধান পদগুলো ভারতীয়দের দখলে, যার ফলে বার্ষিক আয়ের সিংহভাগ ভারত থেকে আসে।
তুলনামূলকভাবে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও যথেষ্ট ভালোভাবে আয় করছে। আইসিসি থেকে প্রাপ্ত রেভিনিউ চার দশমিক পাঁচ শতাংশ, যা ২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত ভারতকে চরম চাপের মুখে ফেলেছে। আমাদের স্টার ফাস্ট বোলার মোস্তাফিজকে আইপিএলে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা, এবং আসন্ন টি২০ বিশ্বকাপে ভারতের মাঠে না খেলার ঘোষণা একদিকে দেশের মর্যাদা রক্ষা করেছে, অন্যদিকে ভারতকে আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দার মুখে ফেলেছে। এই সাহসী পদক্ষেপের জন্য বাংলাদেশ সরকার, ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের প্রশংসা করা প্রয়োজন।
জাতির মর্যাদা ক্রিকেটের চেয়ে বড়। বর্তমান সময়ে কিছু খেলোয়াড় এবং স্টাররা ব্যক্তিগত স্বার্থকে দেশের স্বার্থের উপরে স্থাপন করছেন, যা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং জনমনে হতাশা সৃষ্টি করছে। দেশে ক্রিকেটের প্রতি উদ্দীপনা থাকা সত্ত্বেও, দেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা কোনো অর্থ, জনপ্রিয়তা বা ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে উঁচু। মোস্তাফিজের অপমান, অর্থের লোভে কোনো খেলোয়াড়কে স্পর্শ করতে পারেনি, এবং এটি আমাদের জাতির জন্য একটি দৃঢ় বার্তা।
ভারতের অর্থনীতি ও সামরিক শক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ হলেও এর প্রভাব সীমিত। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী নীতি একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করতে ব্যর্থ। প্রতিবেশী পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও মালদ্বীপের সঙ্গে ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আফগানিস্তান ও ভারতের সম্পর্ক সাময়িক উষ্ণ হলেও, এ অঞ্চলের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ ও নর্দার্ন অ্যালায়েন্সে ভারতীয় হস্তক্ষেপে প্রভাবিত। এই বিশ্বাস ঘাটতি সবসময় থাকাই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব এবং বেগম খালেদা জিয়ার সময়কালেও ভারত দেশের স্বার্থে চাপ প্রয়োগ করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের স্বার্থ রক্ষা ও ভারতীয় চাপ মোকাবিলায় দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছে। ক্রিকেটার মোস্তাফিজকে কেন্দ্র করে ভারতীয় প্রভাবের বিরুদ্ধে সরকারের সাহসী সিদ্ধান্ত দেশের মর্যাদা এবং জাতির অহংকার রক্ষা করেছে।
ভারতীয় হুমকি, উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকারের আচরণ এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন নতুন করে প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশকে স্বাধীনভাবে পরিচালিত করা অপরিহার্য। শহীদ ওসমান হাদির হত্যার পর জনগণের শোক দেশের শক্তি হিসেবে কাজ করেছে এবং জাতীয় একতা আরও দৃঢ় হয়েছে। ক্রিকেটের মতো সবার নজরের খেলার ক্ষেত্রেও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত স্বার্থ কখনো দেশের মর্যাদার উপরে স্থাপন করা উচিত নয়।
বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করছে যে, দেশের কূটনৈতিক, রাজনৈতিক এবং ক্রীড়া নীতি একত্রিত হয়ে দেশের মর্যাদা রক্ষা করছে। ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ একতাবদ্ধ। দেশের নেতৃত্ব ও ক্রিকেট বোর্ডের দৃঢ়তা প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশে দেশপ্রেম ও আত্মসম্মানবোধ এখনও অক্ষুণ্ণ। আগামী প্রজন্ম এই সাহসী ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তগুলোকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
এই ধরনের রাজনৈতিক ও ক্রীড়া পরিস্থিতি দেশের ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষণীয়। জাতীয় স্বার্থে কোনো আপস গ্রহণ করা হবে না, এবং ক্রিকেটের মতো বহুল জনসম্মুখে থাকা খেলা কখনো দেশের মর্যাদার ওপর প্রভাব বিস্তার করবে না। বাংলাদেশের উদ্দীপনা, আত্মসম্মানবোধ এবং সাহসী নেতৃত্ব দেশকে ভারতীয় প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার এক নজির স্থাপন করেছে।
বাংলাদেশ সরকার, ক্রিকেট বোর্ড এবং দেশের জনগণ একত্রিত হয়ে দেখিয়েছে, দেশের মর্যাদা সর্বোচ্চ। ক্রিকেট বা অন্য কোনো খেলার উপরে দেশের স্বার্থ স্থাপন করা উচিত, এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। মোস্তাফিজ ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকার ও ক্রিকেট বোর্ডের দ্রুত, সাহসী এবং কার্যকর পদক্ষেপ এটি প্রমাণ করেছে। দেশের মর্যাদা ক্রিকেটের চেয়ে বড়, এবং এই বার্তা আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্পষ্টভাবে পৌঁছেছে।