প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের রফতানিমুখী ও স্থানীয় জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহ চেইনের সংকট ও দীর্ঘমেয়াদি মন্দার চাপে বিপর্যস্ত এই খাতকে স্বস্তি দিতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাবে, যা এই শিল্পের জন্য এক বড় সহায়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার ২০ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি)-১ থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়। নির্দেশনাটি ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারি করা হয়েছে এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে এ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এর আগে ২০২৩ সালের ৩০ জুনভিত্তিক বিদ্যমান ঋণ স্থিতির ওপর ২.৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট জমা দিয়ে পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করার সময়সীমা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, ইউরোপে সামরিক উত্তেজনা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্থর গতি এবং সরবরাহ চেইনে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নতার কারণে রফতানিমুখী ও স্থানীয় জাহাজ নির্মাণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর নগদ প্রবাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত পরিস্থিতির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধে সক্ষমতা হারায়।
এই বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, আমদানি বিকল্প পণ্যের উৎপাদন ও সম্ভাবনাময় রফতানি খাত হিসেবে জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে সচল রাখা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায়ের স্বার্থও বিবেচনায় নিতে হবে। সে কারণেই প্রকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদন পর্যালোচনা করে প্রতিটি ক্ষেত্রে গুণাগুণ বিচার করে, ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত শ্রেণীকৃত ঋণ বা বিনিয়োগের স্থগিত হিসাবে রাখা সুদ ও অনারোপিত সুদ পৃথক ব্লকড হিসাবে স্থানান্তর করতে পারবে। এরপর অবশিষ্ট ঋণ স্থিতির ওপর মোট ৩ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট আদায় সাপেক্ষে ঋণ পুনঃতফসিল করা যাবে। এই ডাউন পেমেন্টের মধ্যে ১.৫ শতাংশ আবেদন জমা দেওয়ার সময় এবং বাকি ১.৫ শতাংশ পুনঃতফসিল কার্যকর হওয়ার পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। এই শর্ত পূরণ হলে ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ঋণ দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদে বিশেষ পুনঃতফসিল করতে পারবে।
গ্রেস পিরিয়ড চলাকালে গ্রাহককে ঋণের বিপরীতে আরোপিত সুদ মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পরিশোধ করতে হবে। তবে ব্লকড হিসাবে রাখা সুদ গ্রেস পিরিয়ড শেষে আলাদা করে সুদবিহীনভাবে মাসিক বা ত্রৈমাসিক কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ থাকবে। ফলে প্রাথমিক সময়ে মূল ঋণের চাপ কিছুটা কমবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ানোর সময় পাবে।
এর আগে বিআরপিডি সার্কুলার নং-১২/২০২৩-এর আওতায় যেসব ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রেও বাড়তি সুবিধা রাখা হয়েছে। সেসব ঋণ ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট আদায় সাপেক্ষে, অবশিষ্ট মেয়াদের সঙ্গে সর্বোচ্চ দুই বছর যুক্ত করে বিশেষ পুনর্গঠন সুবিধা দেওয়া যাবে। এতে করে আগেই পুনঃতফসিলের আওতায় আসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও স্বস্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানিয়েছে, জাহাজ নির্মাণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও রফতানি কার্যক্রম সচল রাখতে নতুন ঋণ সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশেষ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠিত ঋণের বিপরীতে কোনো কম্প্রোমাইজ অ্যামাউন্ট পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকবে না। এটি শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ছাড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ নতুন কাজ বা অর্ডার বাস্তবায়নে তাদের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হয়।
তবে এই সুবিধার সঙ্গে কঠোর শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠিত ঋণের কিস্তি মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পরিশোধ করতে হবে। কোনো গ্রাহক কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে ঋণ যথানিয়মে শ্রেণীকৃত হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে এসব ঋণের ক্ষেত্রে অশ্রেণিকৃত ঋণের জন্য প্রযোজ্য প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্ট ঋণ বা ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতারা এই বিশেষ সুবিধার আওতায় আসতে পারবেন না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত কারণে প্রকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোই শুধু এই সুযোগ পাবে। এ জন্য ব্যাংকগুলোকে বিশেষ পরিদর্শনের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে যে সংশ্লিষ্ট গ্রাহক বাস্তবিক অর্থেই ক্ষতির শিকার হয়েছে কি না। পরিদর্শনে ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত হলে ব্যাংক নিজস্ব বিবেচনায় ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের গুণগতমান শ্রেণীকরণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, পুনঃতফসিল কার্যকর হওয়ার পর নির্ধারিত ডাউন পেমেন্ট বা ছয়টি মাসিক কিংবা দুইটি ত্রৈমাসিক কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংক বিশেষ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন সুবিধা বাতিল করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে ঋণ আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে ওই ঋণের জন্য আর কোনো পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন সুবিধা দেওয়া হবে না।
এই সুবিধা নিতে আগ্রহী গ্রাহকদের আগামী ৩০ জুনের মধ্যে প্রাথমিক ডাউন পেমেন্ট নগদে জমা দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছে আবেদন করতে হবে। নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করলে এই সার্কুলারের আওতায় কোনো আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না। পাশাপাশি, গ্রাহকের আবেদন পাওয়ার পর ৬০ দিনের মধ্যে ব্যাংককে তা নিষ্পত্তি করতে হবে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামী শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও আলাদা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব ব্যাংককে শরীয়াহ নীতিমালা অনুসরণ করে তাদের প্রদত্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একই ধরনের সুবিধা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়। বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লেও বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সম্ভাবনা এখনো উজ্জ্বল। বড় ছাড় ও দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ পেলে অনেক প্রতিষ্ঠান আবারও উৎপাদন ও রফতানিতে মনোযোগ দিতে পারবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের চাপও কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপ জাহাজ নির্মাণ খাতকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখাবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।