প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় হাসাকাহ প্রদেশের আল-শাদ্দাদি কারাগার থেকে গত সোমবার প্রায় ২০০ ইসলামিক স্টেট (আইএস) বন্দি পালিয়ে গেছে। এই ঘটনা ঘটে কারাগারের নিয়ন্ত্রণ কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) থেকে সিরিয়ান সরকারের হাতে হস্তান্তরের সময় সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার সুযোগে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এবং আঞ্চলিক সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ঘটনাটি ঘটে একীভূতকরণ চুক্তির প্রেক্ষাপটে। রোববার স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে এসডিএফ দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণে রাখা দুটি আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। চুক্তির অংশ হিসেবে এসব এলাকার কারাগারের দায়িত্ব সিরিয়ান সরকারের হাতে হস্তান্তর করা হয়েছিল। তবে হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং তৎপরতা না থাকার অভিযোগে সিরিয়ার সরকার এসডিএফের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করে। দেশের নেতা আহমেদ আল-শারা প্রকাশ্যে কুর্দি স্বায়ত্তশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য করেন এবং তাদের নেতৃত্ব বিলুপ্ত করার ইঙ্গিত দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির পূর্ব থেকেই তারা সবচেয়ে বিপজ্জনক বিদেশি আইএস বন্দিদের নিরাপদ কারাগারে স্থানান্তরের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করছিল। এই প্রচেষ্টা চলাকালীন এসডিএফ প্রহরীরা হঠাৎ আল-শাদ্দাদি কারাগার ত্যাগ করলে স্থানীয়রা প্রায় ২০০ বন্দিকে বের করে আনে। যদিও কারাগারে মূলত এক হাজার বন্দি থাকা সত্ত্বেও ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন প্রায় ২০০ জন। পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে অধিকাংশই নিম্নস্তরের স্থানীয় যোদ্ধা।
কারাগারপলায়নের পরই পরিস্থিতি তীব্র হয়ে ওঠে। সোমবারই সিরিয়ান সেনাবাহিনী শাদ্দাদি শহরে কারফিউ জারি করে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা অভিযান শুরু করা হয় যাতে পলাতক বন্দিদের ধরার চেষ্টা করা যায়। এছাড়া, সেনাবাহিনী স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই কারাগারপলায়ন শুধু স্থানীয় নিরাপত্তার জন্য নয়, পুরো সিরিয়ার এবং প্রায়শই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। পালিয়ে যাওয়া বন্দিরা নতুন করে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে যোগ দিতে পারে। বিশেষ করে সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলগুলো, যেখানে ইতিমধ্যেই নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা রয়েছে, সেখানে এই ঘটনা আরও বড় সমস্যা সৃষ্টি করেছে।
এসডিএফের সাথে সিরিয়ান সরকারের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের সময়ে অসঙ্গতি এবং বিলম্ব এই পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। কুর্দি বাহিনীর দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এই হস্তান্তরকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন জটিল প্রক্রিয়ায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতে আরও অনুরূপ ঘটনা ঘটতে পারে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ ঘটনার প্রভাবও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ও আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, পালিয়ে যাওয়া বন্দিরা সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য অঞ্চলেও সক্রিয় হতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
উল্লেখযোগ্য যে, সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় কারাগারগুলোতে আইএস বন্দিদের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানে বন্দি রাখা শুধুমাত্র স্থানীয় নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিকভাবে আইএসের পুনরুত্থান প্রতিরোধের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণে এই কারাগারপলায়নকে কূটনৈতিক এবং নিরাপত্তা সম্প্রদায় তীব্রভাবে মনোযোগ দিচ্ছে।
এদিকে, স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। কেউ কেউ এই ঘটনাকে নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক মনে করছেন, আবার অনেকে স্থানীয়দের অভ্যন্তরীণ উদ্যোগকে সহায়ক হিসেবে দেখছেন। তবে কারাগারপলায়নের পর সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থার তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শহরের বিভিন্ন প্রবেশপথ কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
উপসংহারে বলা যায়, সিরিয়ার আল-শাদ্দাদি কারাগার থেকে আইএস বন্দিদের পালানোর ঘটনা শুধু স্থানীয় প্রশাসনের জন্য নয়, গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। এই ঘটনায় নতুন করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার এবং কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। একদিকে মানবিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা হলেও অপর দিকে নিরাপত্তার কারণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যম্ভাবী।