শত শত গাড়ি আমদানি, এত কিনছেন কারা?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৪ বার
শত শত গাড়ি আমদানি, এত কিনছেন কারা?

প্রকাশ:২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রাম বন্দরের কার শেড এলাকায় ঢুকলেই চোখে পড়ে সারি সারি নতুন ও রিকন্ডিশন গাড়ি। কয়েক মাস আগেও যেখানে গাড়ি খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, নিলাম আতঙ্ক আর গুদামভাড়ার চাপ নিয়ে আমদানিকারকদের অভিযোগ ছিল, সেখানে এখন চিত্র পুরোপুরি উল্টো। গত ছয় মাসে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের ৭ হাজারেরও বেশি গাড়ি খালাস করে আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টম হাউস। এত অল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক গাড়ি আমদানির পেছনে কারা ক্রেতা, কেন হঠাৎ চাহিদা বেড়ে গেল—এই প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই ৬ হাজার ৬৫১টি গাড়ি ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এবার গাড়ি ডেলিভারি বেড়েছে ১ হাজারের বেশি এবং রাজস্ব আদায়ও বেড়েছে প্রায় ১২৪ কোটি টাকা। এই প্রবৃদ্ধি শুধু সংখ্যায় নয়, মূল্যমানেও উল্লেখযোগ্য। গত ছয় মাসে আমদানি হওয়া গাড়ির মোট মূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বন্দরের তথ্য বলছে, জুলাই মাসে যেখানে মাত্র ৪৩৯টি গাড়ি আমদানি হয়েছিল, পরের মাস আগস্টেই সেই সংখ্যা লাফিয়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫০৫টিতে। এরপর সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বরেও আমদানির ধারা অব্যাহত থাকে। সবশেষ ডিসেম্বর মাসে আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৫৮টি গাড়ি। এই ছয় মাসে ১৬টি বিশেষায়িত রো-রো জাহাজে করে এসেছে ৮৪১টি একেবারে নতুন গাড়ি এবং ৬ হাজার ২২৫টি রিকন্ডিশন গাড়ি। অর্থাৎ, আমদানির বড় অংশই এখনও ব্যবহৃত বা রিকন্ডিশন গাড়ি।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) ওমর ফারুক জানান, বর্তমানে গাড়ির ডেলিভারি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, বন্দরে এখন মোট গাড়ির সংখ্যা মাত্র ৪৭১টি, যার বেশিরভাগই ৩০ দিনের কম সময় ধরে অবস্থান করছে। কয়েক মাস আগেও ডেলিভারি ধীরগতির কারণে বন্দরে অপেক্ষমাণ গাড়ির সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়ে যেত। এখন নিলাম প্রক্রিয়া দ্রুত হওয়ায় এবং ট্যারিফ কাঠামো পরিবর্তনের কারণে গাড়ি ফেলে রাখার সুযোগ পাচ্ছেন না আমদানিকারকরা। ফলে গাড়ি আসার পরপরই ছাড় করিয়ে নিচ্ছেন সবাই।

নিয়ম অনুযায়ী, কোনো গাড়ি আমদানির পর ৩০ দিনের মধ্যে ছাড় না করালে সেটি নিলামের জন্য কাস্টমসের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে বন্দরে নিলামযোগ্য একেবারে নতুন গাড়ির সংখ্যা মাত্র ১০৩টি, যা সাম্প্রতিক সময়ের তুলনায় অনেক কম। এতে বোঝা যায়, আমদানিকারকরা এখন আর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন বলেন, দেশের অর্থনৈতিক সূচক ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। পাশাপাশি উচ্চ আয়ের শ্রেণির মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতাও আগের চেয়ে বেশি। তাঁর মতে, শুধু ব্যক্তিগত নয়, করপোরেট খাত থেকেও গাড়ির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এমনকি বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোও এখন বহর বাড়াচ্ছে।

তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যক্তিগত শখের গাড়ির চেয়ে করপোরেট ক্লায়েন্টদের চাহিদাই বেশি চোখে পড়ছে। বারভিডা (বাংলাদেশ রিকন্ডিশনড ভেহিকলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন)-এর সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান জানান, ট্যারিফ বাড়ার কারণে ওয়ারফেন্ড চার্জ ও গুদাম ভাড়া আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ফলে গাড়ি বন্দরে রেখে অপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। আগে অনেকে শুল্ক কমার আশায় গাড়ি ফেলে রাখতেন, এখন সেই সুযোগ নেই বললেই চলে। তাঁর ভাষায়, বর্তমানে যারা গাড়ি কিনছেন, তাদের বড় অংশই করপোরেট গ্রাহক বা উচ্চ আয়ের পেশাজীবী।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের দুটি কার শেডে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৫০টি গাড়ি রাখার সক্ষমতা রয়েছে। অথচ বর্তমানে সেখানে অপেক্ষমাণ গাড়ির সংখ্যা অর্ধেকেরও কম। দ্রুত ডেলিভারি এবং কম অপেক্ষমাণতা বন্দরের কার্যক্রমকে গতিশীল করলেও, এর পেছনে অর্থনীতির একটি ভিন্ন চিত্রও উঠে আসছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের আগমুহূর্তে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সাধারণত কিছুটা চাঙা হয়। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, করপোরেট ব্যয় এবং ব্যক্তিগত বিনিয়োগ বাড়ে। গাড়ি আমদানির এই ঊর্ধ্বগতি তারই প্রতিফলন হতে পারে। পাশাপাশি ব্যাংকঋণ ও লিজ সুবিধা সহজ হওয়াও একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, প্রশ্ন উঠছে—এই বিপুল গাড়ির ব্যবহার কোথায় হবে? ইতোমধ্যেই রাজধানী ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে যানজট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপরিবহন ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না ঘটিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়লে শহরগুলোর চলাচল ব্যবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠবে। যদিও আমদানিকারক ও বিক্রেতারা বলছেন, বাজারের চাহিদা অনুযায়ীই গাড়ি আসছে, নীতিনির্ধারণের দায়িত্ব সরকারের।

জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে বছরে ২০ হাজারের বেশি গাড়ি আমদানি হয়। ট্যারিফ তুলনামূলক কম হওয়ায় এসব গাড়ির একটি বড় অংশ খালাস হয় মোংলা বন্দরে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরেই গাড়ি খালাসের প্রবণতা বেড়েছে। দ্রুত ডেলিভারি, উন্নত অবকাঠামো ও নিলাম প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে গত ছয় মাসের চিত্র বলছে, গাড়ি আমদানিতে বাংলাদেশ এক নতুন রেকর্ডের মুখোমুখি হয়েছে। এই গাড়িগুলোর বড় ক্রেতা মূলত করপোরেট প্রতিষ্ঠান, উচ্চ আয়ের শ্রেণি ও বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী। প্রশ্ন রয়ে যায়—এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও নগরজীবনে কী প্রভাব ফেলবে? তার উত্তর খুঁজতে এখন চোখ রাখতে হবে নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তের দিকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত