প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে দেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের যে প্রাণস্পন্দন, তা বর্তমানে গুরুতরভাবে ব্যাহত হচ্ছে লাইটার জাহাজের তীব্র সংকটে। বহির্নোঙরে জাহাজ জট এখন আর কেবল একটি সাময়িক সমস্যা নয়; এটি রীতিমতো জাতীয় অর্থনীতি ও ভোক্তা বাজারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তিন লাখ টনেরও বেশি পণ্য নিয়ে ৮৫টির বেশি মাদার ভেসেল গভীর সাগরে অলস অপেক্ষায় রয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। প্রতিদিন প্রতিটি জাহাজের বিপরীতে আমদানিকারকদের গুনতে হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ওয়েটিং চার্জ। এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত এসে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার কাঁধে। সামনে রমজান মাস থাকায় ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরের ভৌগোলিক ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে বড় আকারের মাদার ভেসেল সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারে না। বন্দরের জেটিতে পর্যাপ্ত ড্রাফট না থাকায় বহির্নোঙরে অবস্থানরত এসব জাহাজ থেকে ছোট আকারের লাইটার জাহাজে পণ্য খালাস করে দেশের বিভিন্ন নৌঘাটে পাঠানোই প্রচলিত ব্যবস্থা। কাগজে-কলমে অভ্যন্তরীণ নৌপথে প্রায় দেড় হাজার লাইটার জাহাজ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে সক্রিয় রয়েছে এক হাজারেরও কম। বাকি জাহাজের একটি বড় অংশ স্ক্র্যাপ হয়ে গেছে, কোনোটি ডকে পড়ে আছে, আবার কোনোটি অন্য রুটে চলাচলের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশন থেকে কার্যত বাইরে।
স্বাভাবিক সময়ে বহির্নোঙরে ৩২ থেকে ৩৫টি মাদার ভেসেল পণ্য নিয়ে অপেক্ষা করে। সে সময় প্রায় এক হাজার লাইটার জাহাজ সার্বক্ষণিক অপারেশনে থাকলে ৩৫ থেকে ৩৮টি মাদার ভেসেল নির্বিঘ্নে হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হয়। কিন্তু বর্তমানে বহির্নোঙরে পণ্যবাহী মাদার ভেসেলের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৮৫টির বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চাহিদা অনুযায়ী লাইটার জাহাজ সরবরাহ করতে পারছে না লাইটারেজ জাহাজের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি)। ফলে ধীরে ধীরে এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে এবং দিন দিন জাহাজ জট কেবল বাড়ছেই।
বিডব্লিউটিসিসির নির্বাহী পরিচালক মেজর (অব.) জিএম খান পরিস্থিতির ব্যাখ্যায় জানান, সম্প্রতি হঠাৎ করেই চট্টগ্রাম বন্দরে মাদার ভেসেলের আগমন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এত বিপুল পরিমাণ পণ্য দ্রুত খালাস করা বাস্তবসম্মতভাবে সম্ভব হচ্ছে না। এর পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিএডিসি বিপুল পরিমাণ সার আমদানি করেছে। কিন্তু তাদের নিজস্ব পর্যাপ্ত গুদাম না থাকায় চট্টগ্রাম থেকে সার নিয়ে যেসব লাইটার দেশের বিভিন্ন এলাকায় গেছে, সেগুলোর একটি বড় অংশ দেড় থেকে দুই মাসেও ফিরে আসেনি। বর্তমানে শুধু বিএডিসির ১৫৩টি লাইটার জাহাজ ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
এ ছাড়া বড় বড় শিল্প গ্রুপ হঠাৎ করেই বিপুল পরিমাণ গম আমদানি করেছে। এসব গম দেশের বিভিন্ন ঘাটে নামানোর পর সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় দেড়শ লাইটার জাহাজ ভাড়া নিয়ে আটকে রেখেছে। এতে করে অপারেশনের বাইরে চলে গেছে প্রায় ৩০০ জাহাজ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের একই ধরনের আচরণ। সব মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ লাইটার জাহাজ বিভিন্ন এলাকায় আটকে রয়েছে। এর ওপর স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি সংখ্যক মাদার ভেসেল আসায় পুরো ব্যবস্থাটিই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ মনে করেন, রমজানের আগে প্রতি বছরই লাইটার জাহাজের সংকট দেখা দিলেও এবার পরিস্থিতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তাঁর মতে, এটি মূলত দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল। গত দুই থেকে আড়াই দশক ধরে সমস্যাটি চলমান থাকলেও কার্যকর ও টেকসই সমাধান নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষ, নৌ পরিবহন অধিদপ্তর এবং লাইটার জাহাজ মালিকদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন। শুধু লাইটার জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করাই নয়, দেশের বিভিন্ন ঘাটে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত জেটিগুলোও এখন বাড়তি চাপ নিতে সক্ষম নয়। সংকটের সময় নৌ পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের অভিযানের নামে জরিমানা লাইটার মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
জাহাজ ব্যবসায়ী লিটমন শিপিংয়ের মালিক বেলায়েত হোসেন বলেন, একটি মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসের জন্য দৈনিক গড়ে তিন থেকে চারটি লাইটার জাহাজ প্রয়োজন হয়। সে হিসেবে বহির্নোঙরে থাকা ৮৫টি জাহাজের বিপরীতে প্রতিদিন ২৬৫ থেকে ৩২০টি লাইটার জাহাজের সরবরাহ দরকার। বাস্তবে বিডব্লিউটিসিসি সর্বোচ্চ ৪৫ থেকে ৬০টির বেশি লাইটার জাহাজ দিতে পারছে না। এই বিশাল ঘাটতির কারণে পণ্য খালাস মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমাধান না এলে আসন্ন রমজানে নিত্যপণ্যের বাজারে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র ও পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক জানান, রমজানের আগে প্রতি বছরই বাল্ক কার্গো আমদানি বাড়ে এবং এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে লাইটার জাহাজের সংকটের কারণে একটি ৫০ হাজার টনের মাদার ভেসেল যেখানে আগে চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে খালাস করা যেত, সেখানে এখন আট থেকে নয় দিন সময় লাগছে। নিরবচ্ছিন্ন অপারেশন বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক লাইটার জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে—এমন অভিযোগের কথাও তিনি স্বীকার করেন। বন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন এবং কোনো জাহাজ ৭২ ঘণ্টার বেশি পণ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে একটি লাইটার জাহাজ যখন পণ্য নিয়ে দেশের অন্য কোনো গন্তব্যে গিয়ে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে বন্দর কর্তৃপক্ষের সরাসরি কিছু করার সুযোগ নেই। সে কারণে ঘাট এলাকাগুলোয় স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে অভিযান জোরদারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকট শুধু বন্দর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক নৌ পরিবহন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাকেও নগ্নভাবে সামনে এনে দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া প্রতি বছর রমজানের আগে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। আমদানিকারক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—সবাই এই অব্যবস্থাপনার খেসারত দিচ্ছেন। দ্রুত সমন্বিত সিদ্ধান্ত, লাইটার জাহাজের অপব্যবহার বন্ধ এবং নৌঘাট ও জেটির সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক এই সংকট ভবিষ্যতে আরও গভীর হতে পারে।