রোজার বাজারে ছোলা-চিনিতে স্বস্তি, ভোজ্যতেলে শঙ্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৪ বার
রোজার বাজারে ছোলা-চিনিতে স্বস্তি, ভোজ্যতেলে শঙ্কা

প্রকাশ: ২২  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে পবিত্র রমজান শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় দেশের বাজারে ধীরে ধীরে রোজার পণ্যের আমদানি ও বেচাকেনার মৌসুম জমে উঠছে। প্রতি বছরের মতো এবারও রোজাকে কেন্দ্র করে ভোক্তাদের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের জোগান ও দামের বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সব পণ্যের ক্ষেত্রে চিত্র একরকম নয়। ছোলা, মসুর ডাল ও চিনির আমদানি তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক হলেও ভোজ্যতেল ও মটর ডালের আমদানি এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। খেজুরের ক্ষেত্রেও আমদানি শুরু হলেও তা এখনো মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

এনবিআর থেকে পাওয়া ১ নভেম্বর থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় আড়াই মাসের আমদানি তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে সমুদ্র ও স্থলবন্দর দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রোজার পণ্য খালাস হয়েছে। তবে আমদানিকারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর বাইরেও আমদানির পাইপলাইনে আরও পণ্য রয়েছে, যা আগামী কয়েক সপ্তাহে দেশে প্রবেশ করবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে রোজাকেন্দ্রিক পণ্যের আমদানি আরও বাড়বে। এতে সরবরাহ নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা অনেকটাই কেটে যেতে পারে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে একসঙ্গে বেশি পণ্য এলে তা দ্রুত কারখানায় নেওয়া, প্রক্রিয়াজাত করা এবং বাজারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

এই চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের কারণে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের দিন যান চলাচল বন্ধ থাকবে। এর আগের দিনগুলোতে চলবে প্রচারণা ও রাজনৈতিক তৎপরতা। ফলে সড়ক, বন্দর ও সরবরাহব্যবস্থায় সাময়িক বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই সময়ে যদি পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়, তাহলে বাজারে সাময়িক সংকট তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে দামে।

শীর্ষ পর্যায়ের ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল মনে করেন, পণ্যের প্রকৃত ঘাটতির আশঙ্কা নেই। তাঁর ভাষায়, রোজার জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করা হচ্ছে এবং আরও আসবে। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমদানি করা কাঁচামাল দ্রুত কারখানায় নেওয়া এবং প্রক্রিয়াজাত পণ্য নির্বিঘ্নে বাজারজাত করা। এই প্রক্রিয়াটি যদি কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে যদি সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা যায়, তাহলে রোজার বাজারে বড় ধরনের সংকট হবে না।

ভোজ্যতেল নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। রোজার মাসে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ভোজ্যতেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, রোজায় ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় তিন লাখ টন। গত আড়াই মাসে দেশে সয়াবিন ও পাম তেল মিলিয়ে আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ৩৮ হাজার টন। যদিও এই পরিমাণ শুনতে বেশি মনে হলেও গত রোজার আগের একই সময়ের তুলনায় তা ৫৬ হাজার টন কম। এই তথ্য বাজারে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করেছে।

তবে পুরো চিত্রটি এতটা নেতিবাচক নয়। অপরিশোধিত তেল আমদানির পাশাপাশি দেশে সয়াবিন বীজ আমদানি করে তেল উৎপাদন করা হয়। চলতি মৌসুমে সয়াবিন বীজের আমদানি বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার টন। এর ফলে অতিরিক্ত ২৫ থেকে ৩০ হাজার টন সয়াবিন তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। ভোজ্যতেলের শীর্ষ আমদানিকারক টি কে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক মোহাম্মদ মুস্তাফা হায়দার বলেন, এই মুহূর্তে ভোজ্যতেলের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় আমদানিও কিছুটা কম হয়েছে। তবে রোজার আগে আরও কয়েকটি জাহাজ বন্দরে ভিড়বে। তাই বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা তিনি দেখছেন না।

ভোজ্যতেলের মতোই মটর ডালের আমদানিও কমেছে। গত আড়াই মাসে দেশে মটর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ লাখ ৬৮ হাজার টন কম। এই তথ্য বাজার বিশ্লেষকদের কিছুটা চিন্তিত করেছে। কারণ, রোজায় মটর ডালের ব্যবহার বাড়ে এবং এটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্য।

অন্যদিকে ছোলার বাজারে স্বস্তির খবর রয়েছে। রোজার মাসে ছোলার চাহিদা থাকে প্রায় এক লাখ টন। চলতি মৌসুমে নভেম্বর থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে ছোলা আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার টন। এটি গত রোজার আগের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক লাখ টন বেশি। স্বাভাবিক চাহিদা বাদ দিয়েও বাজারে ছোলার সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

মসুর ডালের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ইতিবাচক চিত্র দেখা যাচ্ছে। গত আড়াই মাসে দেশে মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক লাখ টন বেশি। ফলে রোজার বাজারে মসুর ডালের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

চিনির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক। রোজায় চিনির চাহিদা প্রায় তিন লাখ টন বলে ধারণা করা হয়। রোজা সামনে রেখে গত প্রায় তিন মাসে দেশে চিনি আমদানি হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টন, যা গত বছরের তুলনায় ২ লাখ ২৭ হাজার টন বেশি। এই অতিরিক্ত আমদানি বাজারে চিনির জোগান নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খেজুর রোজার একটি অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। দেশে রোজায় খেজুরের চাহিদা প্রায় ৬০ হাজার টন। নভেম্বর থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে আমদানি হয়েছে প্রায় ২১ হাজার টন, যা মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি। খেজুর প্রক্রিয়াজাত করার প্রয়োজন না থাকায় শেষ মুহূর্তে আমদানি হলেও দ্রুত বাজারজাত করা সম্ভব। খাতুনগঞ্জের খেজুর আমদানিকারক ফারুক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার ফারুক আহমেদ বলেন, শুল্ক কমার প্রত্যাশায় অনেক আমদানিকারক অপেক্ষায় ছিলেন। ডিসেম্বরে শুল্ক কমানোর পর আমদানি বাড়তে শুরু করেছে এবং রোজার আগেই তা বাজারে চলে আসবে। বিশ্ববাজারেও খেজুরের দাম স্থিতিশীল থাকায় বড় সংকটের আশঙ্কা কম।

রোজার বাজার পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নির্বাচন ও প্রচারণার কারণে সরবরাহশৃঙ্খল সচল রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় উৎপাদন, আমদানি ও মজুতের তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা করে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য বজায় রাখা সরকারের দায়িত্ব। তিনি মনে করেন, এখন থেকেই নজরদারি ও তদারকি জোরদার করা হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট বা অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ কমে যাবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, রোজার বাজারে সব পণ্যের পরিস্থিতি একরকম নয়। কিছু পণ্যে স্বস্তি থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি। সঠিক সময়ে আমদানি, নির্বিঘ্ন পরিবহন ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে রোজার পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত