দুই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মান্না, সমঝোতা নিয়ে ধোঁয়াশা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৩ বার
দুই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মান্না, সমঝোতা নিয়ে ধোঁয়াশা

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার দুই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা। একদিকে কিশোরগঞ্জ নয়, বরং বগুড়া-২ আসন; অন্যদিকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আসন ঢাকা-১৮—দুটি আসনেই তিনি প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। অথচ নির্বাচনি সমঝোতার অংশ হিসেবে বিএনপির সঙ্গে নাগরিক ঐক্যের যে সমঝোতার কথা ছিল, তা বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। ফলে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের মধ্যে নির্বাচনি বোঝাপড়া আদৌ কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবে বিএনপি নাগরিক ঐক্যকে বগুড়া-২ আসন ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দেয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রকাশ্যেই জানিয়েছিলেন, আসনটি নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার জন্য ফাঁকা রাখা হবে। এই ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহলে ধারণা তৈরি হয়, বগুড়া-২ আসনে মান্নার প্রার্থিতা নিশ্চিত। কিন্তু নির্বাচনি প্রক্রিয়া এগোতেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।

২ জানুয়ারি বগুড়া-২ আসনে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তা মান্নার মনোনয়ন বাতিল করেন। এতে সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ে। তবে মান্না নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করলে পরবর্তীতে তাঁর প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়। একই সময় তিনি ঢাকা-১৮ আসনেও মনোনয়নপত্র জমা দেন, যেখানে কোনো জটিলতা ছাড়াই তাঁর মনোনয়ন বৈধতা পায়। ফলে মান্না একসঙ্গে দুই আসনে বৈধ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনি মাঠে অবস্থান নিতে সক্ষম হন।

এই অবস্থায় বিএনপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হয়, কারণ বগুড়া-২ আসনে সমঝোতার কথা থাকলেও দলটি সেখানে চূড়ান্তভাবে প্রার্থী ঘোষণা করে। শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মীর শাহে আলমকে বগুড়া-২ আসনে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। একইভাবে ঢাকা-১৮ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পান ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন। ফলে দুই আসনেই এখন মান্না ও বিএনপির প্রার্থীরা আলাদাভাবে প্রচারণার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

এই প্রেক্ষাপটে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক হিসেবে নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক এবং নির্বাচনি সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। নাগরিক ঐক্যের নেতারা বলছেন, সমঝোতার কথা বলেও বিএনপি শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিষয়টি এখনো আলোচনার মধ্যে রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।

বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এ বিষয়ে বলেন, বর্তমানে দুই আসনেই মান্না রয়েছেন এবং বিএনপির প্রার্থীরাও আছেন। বিষয়টি আলোচনার মধ্যেই আছে। আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে, মান্না কোন আসনে থাকবেন, নাকি আদৌ থাকবেন কি না। শিগগিরই বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তবে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত তিনি জানেন না বলেও মন্তব্য করেন।

মান্নার সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম খান বলেন, তাঁর সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। সম্ভবত বিএনপির চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, তবে সে বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই। এই বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়, দলটির ভেতরেই এখনো সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।

অন্যদিকে নাগরিক ঐক্যের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাকিব আনোয়ার জানিয়েছেন, বিএনপির সঙ্গে এ বিষয়ে সাম্প্রতিক কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে এ নিয়ে আর কোনো বৈঠক বা আলোচনা হয়নি। বিএনপি যদি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে থাকে, সেটি তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সাকিব আনোয়ার আরও জানান, ১৮ জানুয়ারি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হাসপাতালে মান্নাকে দেখতে গেলে তখনো এই বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। সেদিন কেবল মান্নার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবরই নেওয়া হয়।

সাকিব আনোয়ার বলেন, যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপি ও নাগরিক ঐক্য একসঙ্গেই রাজপথে লড়াই করেছে। ভবিষ্যতে জাতীয় সরকার গঠনের বিষয়েও তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় নির্বাচনি জোট বা সমঝোতার সময় বিএনপি নাগরিক ঐক্যকে বগুড়া-২ আসন দেয় এবং স্পষ্টভাবে জানায়, আসনটি মান্না ভাইয়ের জন্য ফাঁকা রাখা হবে। কিন্তু পরে সেখানে বিএনপি প্রার্থী দেওয়ায় নাগরিক ঐক্যের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর গুলশানে শোক জানাতে গেলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়। তখন তারেক রহমান জানান, মনোনয়ন নিয়ে জটিলতার কারণে আসনটি হাতছাড়া না করতে অতিরিক্ত একজন প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আশ্বাস দেওয়া হয় যে, মান্নার দুই আসনের প্রার্থিতাই যেহেতু বৈধ হয়েছে, বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সেই সমাধানের কোনো অগ্রগতি হয়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি যুগপৎ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ ও নির্বাচনি ঐক্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। একদিকে নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে অংশ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে আসন সমঝোতা নিয়ে এমন টানাপোড়েন ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে বগুড়া-২ ও ঢাকা-১৮—দুটি আসনই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্লেষকরা আরও মনে করছেন, মান্নার দুই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা নাগরিক ঐক্যের কৌশলগত অবস্থানকেও তুলে ধরে। দলটি দেখাতে চাইছে, তারা এককভাবেও নির্বাচনে টিকে থাকতে সক্ষম। একই সঙ্গে এটি বিএনপির ওপর চাপ সৃষ্টির একটি উপায় হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যাতে সমঝোতার বিষয়টি দ্রুত চূড়ান্ত করা হয়।

সব মিলিয়ে, মান্নার দুই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিএনপির প্রার্থী ঘোষণাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই জটিলতা নির্বাচনি রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় শেষ হলেও কোন আসনে কে থাকবেন, কিংবা আদৌ সমঝোতা বাস্তবায়িত হবে কি না—সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা করা হলেও, ততদিন পর্যন্ত যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সম্পর্ক ও নির্বাচনি কৌশল নিয়ে আলোচনা চলতেই থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত