প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজা সংকট ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারিতে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস যদি নিরস্ত্র না হয়, তাহলে তাদের সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে—এমন স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা দিয়েছেন তিনি। বুধবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মঞ্চ থেকে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। ইসরাইলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইল এ তথ্য জানিয়েছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মতো একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্পের এই বক্তব্য শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতিতেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। গাজা যুদ্ধ, হামাস-ইসরাইল সংঘাত এবং ফিলিস্তিনি জনগণের মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে তাঁর এই বক্তব্য নতুন করে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে দাবি করেন, হামাস ইতোমধ্যেই তাদের অস্ত্র ত্যাগ করতে সম্মত হয়েছে। যদিও বাস্তবে হামাসের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে এমন কোনো ঘোষণা এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। ট্রাম্প বলেন, হামাসের জন্য অস্ত্র ত্যাগ করা নিঃসন্দেহে কঠিন একটি সিদ্ধান্ত। তবে তাঁর ভাষায়, সংগঠনটি নাকি এই পথে এগোতে রাজি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আগামী দুই-তিন দিন, সর্বোচ্চ তিন সপ্তাহের মধ্যেই আমরা বুঝতে পারব, তারা সত্যিই নিরস্ত্র হচ্ছে কি না।’ তাঁর এই বক্তব্যে সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে নজর কাড়ে।
তবে হামাসের পক্ষ থেকে এই দাবির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। বরং অতীতে সংগঠনটি একাধিকবার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা সশস্ত্র প্রতিরোধকে নিজেদের অস্তিত্ব ও সংগ্রামের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে ট্রাম্পের এই দাবি কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে।
দাভোসের বক্তব্যে ট্রাম্প আরও একটি বিস্ময়কর দাবি করেন। তিনি বলেন, প্রায় ৫৯টি দেশ গাজায় একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে অংশ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই বাহিনীর মূল উদ্দেশ্য হবে হামাসকে নির্মূল করা এবং গাজায় দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। ট্রাম্পের মতে, এটি হবে একটি বহুজাতিক উদ্যোগ, যার মাধ্যমে গাজাকে নতুন প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনা হবে।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, বহু দেশই গাজায় সরাসরি সেনা পাঠাতে অনাগ্রহী। এমনকি আজারবাইজান ইতোমধ্যেই প্রকাশ্যে জানিয়েছে, তারা এই বাহিনীতে অংশ নেবে না। ইউরোপের কয়েকটি দেশও বিষয়টি নিয়ে নীরব অবস্থান নিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব প্রস্তুতির মধ্যে বড় ধরনের ফাঁক রয়েছে।
ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে গাজাকে ধীরে ধীরে নিরস্ত্রীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামোর পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে গাজায় একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যেখানে নিরাপত্তা ও প্রশাসনে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধান থাকবে। তবে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে, বাস্তবে আন্তর্জাতিক বাহিনীর ভূমিকা সীমিত হয়ে সীমান্ত নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তায় কেন্দ্রীভূত থাকতে পারে। হামাসকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার মতো বড় দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক দেশই পিছিয়ে থাকতে চায়।
এই প্রেক্ষাপটে ইসরাইলের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসনে তুরস্ক ও কাতারের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, তুরস্ক বা কাতারের কোনো বাহিনী গাজায় প্রবেশ করতে পারবে না। ইসরাইলের দৃষ্টিতে এই দুই দেশ হামাসের প্রতি সহানুভূতিশীল, ফলে তাদের উপস্থিতি গাজার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে বলে মনে করে তেল আবিব।
নেতানিয়াহুর এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের জটিল কূটনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র গাজায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগের কথা বলছে, অন্যদিকে ইসরাইল স্পষ্ট করে কিছু দেশকে বাদ দেওয়ার দাবি তুলছে। এতে করে ভবিষ্যৎ কোনো সমাধান কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ট্রাম্পের বক্তব্য গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। গাজায় দীর্ঘদিনের সংঘাতে ইতোমধ্যেই হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং মানবিক পরিস্থিতি চরমে পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতিতে ‘নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া’—এই ধরনের ভাষা পরিস্থিতিকে আরও সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে মনে করছেন মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তাদের মতে, যে কোনো শান্তি পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনি জনগণের নিরাপত্তা, অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক কৌশলের অংশও হতে পারে। তিনি বরাবরই শক্ত ভাষা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক ইস্যুতে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে এমন হুঁশিয়ারি বাস্তবায়ন করতে গেলে তা বড় ধরনের সামরিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে হামাসকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার ঘোষণা বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
গাজা সংকটের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সামরিক অভিযানের মাধ্যমে কোনো গোষ্ঠীকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা সহজ নয়। বরং সহিংসতা আরও গভীর ক্ষোভ ও প্রতিরোধের জন্ম দেয়। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক রাজনৈতিক সমাধান ও সংলাপের ওপর জোর দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে, দাভোসে দেওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য গাজা সংকটকে নতুন এক মোড়ে নিয়ে এসেছে। তাঁর হুঁশিয়ারি, দাবি ও পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহের ওপর। হামাস নিরস্ত্র হবে কি না, আন্তর্জাতিক বাহিনী আদৌ গঠিত হবে কি না এবং ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের মধ্যে কতটা সমন্বয় থাকে—এই সব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে গাজার ভবিষ্যৎ। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ট্রাম্পের এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পথকে আরও জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলেছে।