প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শীতের কুয়াশা আর ঠান্ডাকে উপেক্ষা করে সাতক্ষীরার মাঠজুড়ে এখন ব্যস্ততার চিত্র। ভোরের শিশির ভেজা জমিতে কৃষকেরা নেমে পড়ছেন বোরো ধান রোপণের কাজে। কোথাও বীজতলা থেকে চারা তোলা, কোথাও জমি প্রস্তুত, আবার কোথাও সার ও সেচের হিসাব—সব মিলিয়ে জেলার গ্রামগুলোতে এখন বোরো মৌসুমের প্রাণচাঞ্চল্য। কৃষিনির্ভর এই জেলায় বোরো ধান শুধু একটি ফসল নয়, এটি কৃষকের জীবিকা, পরিবারের ভরসা আর সারা বছরের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান অবলম্বন। মৌসুমের শুরুতেই যে উৎসাহ ও কর্মব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে, তাতে এবারও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী কৃষি বিভাগ।
সরজমিনে সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলার মাঠ ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমিতে সারিবদ্ধভাবে বোরো ধানের চারা রোপণ করছেন কৃষকেরা। অনেক জায়গায় নারীরা দল বেঁধে চারা লাগাচ্ছেন, পুরুষেরা ব্যস্ত জমিতে পানি সরানো ও সমান করার কাজে। কেউ কেউ বীজতলায় নষ্ট হয়ে যাওয়া পাতার চিন্তায় পড়লেও সামগ্রিকভাবে মাঠে কাজের গতি থেমে নেই। কৃষকেরা বলছেন, শীতের প্রকোপ কিছুটা বেশি হলেও সময়মতো চাষাবাদ না করলে ফলন ব্যাহত হতে পারে—এই ভাবনা থেকেই তারা ঠান্ডাকে পাত্তা না দিয়ে মাঠে নেমেছেন।
সাতক্ষীরার বোরো চাষের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো মৎস্য ঘেরের জমিতে ধান উৎপাদন। জেলার নিম্নাঞ্চলীয় এলাকায় মিঠা পানির ঘেরে বছরের একটি সময় মাছ চাষ হয়। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে মাছ তুলে নেওয়ার পর সেই ঘেরের পানি নিষ্কাশন করে শুরু হয় বোরো ধানের চাষ। চলতি মৌসুমেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। অনেক কৃষক জানিয়েছেন, গত বছরগুলোতে মাছ চাষে লোকসান হওয়ায় তারা বিকল্প হিসেবে ঘেরেই বোরো ধান লাগাচ্ছেন। এতে একদিকে জমির সদ্ব্যবহার হচ্ছে, অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে ঝুঁকি কম থাকায় তারা আশাবাদী।
তবে আশার পাশাপাশি দুশ্চিন্তাও আছে। কৃষকেরা বলছেন, জলাবদ্ধতা এখনো বড় সমস্যা হয়ে আছে। অনেক এলাকায় পানি নিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় জমিতে অতিরিক্ত পানি জমে থাকে, যা চারা রোপণ ও শিকড় গজানোর ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। শীতের কারণে বীজতলায় ধানের পাতায় কিছুটা ক্ষতির আশঙ্কাও করছেন তারা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে উৎপাদন ব্যয়ের চাপ। সার, কীটনাশক ও বীজের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। শীতের মধ্যে মাঠে কাজ করা কঠিন হওয়ায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে, ফলে মজুরিও বেড়েছে। সব মিলিয়ে বোরো চাষের খরচ কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ অবস্থায় কৃষকেরা সরকারের সহায়তা কামনা করছেন। তাদের দাবি, সার ও কীটনাশকের বাজার নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে, যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো না হয়। পাশাপাশি বোরো চাষে ভর্তুকি বাড়ানো এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান করা হলে তারা আরও উৎসাহ নিয়ে চাষাবাদ করতে পারবেন। অনেক কৃষক বলছেন, বোরো ধান দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই এই মৌসুমে কৃষকের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
জেলা কৃষি বিভাগ অবশ্য পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদী। কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কুয়াশা বা শীত বোরো ধানের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হবে না। বরং সঠিক পরিচর্যা ও সময়মতো সেচ নিশ্চিত করা গেলে ফলন ভালো হবে। জেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, সাতক্ষীরায় বোরো ধানের চাষ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে হয়। কৃষকেরা এখন অনেক সচেতন। বীজতলা ব্যবস্থাপনা, সার প্রয়োগ ও সেচের বিষয়ে তারা আগের চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখেন। ফলে সাময়িক কিছু সমস্যা থাকলেও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলায় মোট ৮০ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমি রয়েছে মৎস্য ঘেরের আওতায়। এই ঘেরভিত্তিক চাষ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ধান উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে জেলা থেকে ৩ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি ধান উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা জেলার অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি জাতীয় খাদ্য ভাণ্ডারেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
স্থানীয় কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে বোরো চাষ টিকিয়ে রাখতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, খাল-বিল খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি রোগবালাই ও পোকামাকড় দমনে প্রশিক্ষণ বাড়ানো জরুরি। এতে উৎপাদন খরচ কমবে এবং কৃষকের লাভ বাড়বে।
গ্রামের সাধারণ মানুষও বোরো মৌসুমকে ঘিরে আশাবাদী। কারণ ধান ভালো হলে শুধু কৃষকই নয়, স্থানীয় শ্রমিক, পরিবহন খাত, মিল মালিকসহ অনেকেই উপকৃত হন। বোরো মৌসুম মানেই গ্রামবাংলায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়া। বাজারে কেনাবেচা বাড়ে, মানুষের হাতে কিছু নগদ টাকা আসে। তাই এই ফসলের সফলতা পুরো এলাকার জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সব দিক বিবেচনায় বলা যায়, সাতক্ষীরায় চলতি বোরো মৌসুমের শুরুটা বেশ আশাব্যঞ্জক। শীত, জলাবদ্ধতা ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ সত্ত্বেও কৃষকেরা হাল ছাড়ছেন না। মাঠে তাদের শ্রম আর প্রত্যাশার ঘাম ঝরছে। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলে এবারও সাতক্ষীরার বোরো ধান উৎপাদনে নতুন রেকর্ড হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শীতের কুয়াশার আড়ালে তাই জেলায় জেলায় এখন সবুজ স্বপ্ন বুনছেন কৃষকেরা—ভালো ফলন, ন্যায্য দাম আর স্বস্তির ভবিষ্যতের স্বপ্ন।