প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নিজেদের শক্ত অবস্থান আরও একবার প্রমাণ করল আফগানিস্তান। দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এক ম্যাচ বাকি থাকতেই সিরিজ নিশ্চিত করে ক্রিকেট বিশ্বকে নতুন করে বার্তা দিয়েছে রশিদ খানের দল। বুধবার ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৩৯ রানে হারিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজে ২–০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আফগানিস্তান। এই জয়ের নায়ক রহস্য স্পিনার মুজিব উর রহমান, যিনি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে হ্যাটট্রিক করে ইতিহাসে নাম লেখান তৃতীয় আফগান বোলার হিসেবে।
গত বছরের অক্টোবরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশের কাছে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হওয়ার পর আফগানিস্তান যেন নতুন করে জেগে উঠেছে। এরপর জিম্বাবুয়েকে ধবলধোলাই এবং একমাত্র টি-টোয়েন্টিতে কাতারকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে ছিল তারা। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো শক্তিশালী দলকে সিরিজ হারিয়ে দিল আফগানরা। এই টানা ছয় ম্যাচের জয় আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে তাদের প্রস্তুতিকে দিয়েছে নতুন মাত্রা।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে টস জিতে আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় আফগানিস্তান। শুরুটা অবশ্য ভালো হয়নি। পাওয়ারপ্লের মধ্যেই দুই ওপেনারকে হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে যায় দলটি। রহমানউল্লাহ গুরবাজ মাত্র ১ রান করে শামার জোসেফের বলে বিদায় নেন। অন্য ওপেনার ইব্রাহিম জাদরান ১৭ বলে ২২ রান করে ম্যাথিউ ফোর্ডের বলে বোল্ড হলে শুরুর ধাক্কা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কিন্তু এই চাপ সামলে ইনিংস গুছিয়ে নেন সেদিকুল্লাহ আতাল ও দারবিশ রাসুলি। দুজনের ব্যাটিংয়ে ছিল ধৈর্য, পরিমিত আগ্রাসন এবং ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝার পরিণত বোধ। তৃতীয় উইকেটে তাদের ১১৫ রানের জুটি আফগানিস্তানকে শক্ত ভিত দেয়। রাসুলি শুরু থেকেই কিছুটা আক্রমণাত্মক ছিলেন। মাত্র ২৭ বলে ফিফটি পূর্ণ করে তিনি বুঝিয়ে দেন বড় ইনিংসের ইঙ্গিত। অন্যদিকে আতাল ধীরে শুরু করে মাঝের ওভারগুলোতে গতি বাড়ান।
দারবিশ রাসুলি ৩৯ বলে ৫টি চার ও ৩টি ছক্কায় ৬৮ রান করে আউট হন। সেদিকুল্লাহ আতাল ৪২ বলে ২টি চার ও ৩টি ছক্কায় করেন ৫৩ রান। টানা দুই ওভারে এই দুই সেট ব্যাটারের বিদায়ে কিছুটা ছন্দপতন ঘটলেও শেষ দিকে আজমতুল্লাহ ওমরজাই ও মোহাম্মদ নবী দায়িত্বশীল ব্যাটিং করেন। ওমরজাই ১৩ বলে ২৬ রানের ক্যামিও ইনিংস খেলেন, আর নবী ৫ বলে ৭ রান যোগ করেন। বিশেষ করে গুদাকেশ মোটির শেষ ওভারে ১৯ রান তুলে আফগানিস্তান নির্ধারিত ২০ ওভারে ৪ উইকেটে ১৮৯ রানের বড় সংগ্রহ দাঁড় করায়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফিল্ডিংও এদিন হতাশাজনক ছিল। চারটি সহজ ক্যাচ ফেলে তারা নিজেদের কাজ আরও কঠিন করে তোলে।
লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায় ক্যারিবীয়রা। পাওয়ারপ্লেতে মাত্র ২৯ রান তুলতে সক্ষম হয় তারা। ইব্রাহিম জাদরানের সরাসরি থ্রোতে রানআউট হন এলিক আথানাজে। এরপর অষ্টম ওভারের শেষ দুই বলে ইভিন লুইস ও জনসন চার্লসকে ফিরিয়ে দিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন মুজিব উর রহমান। এখান থেকেই আফগানিস্তান পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেয়।
মাঝে কিছুটা প্রতিরোধ গড়েন শিমরন হেটমায়ার। নূর আহমদ ও মোহাম্মদ নবীর বিপক্ষে একের পর এক ছক্কা হাঁকিয়ে ১৭ বলে ৪৬ রান করেন তিনি। অধিনায়ক ব্র্যান্ডন কিংয়ের সঙ্গে তার ৩৩ বলে ৬৮ রানের জুটি ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ম্যাচে ফেরার স্বপ্ন দেখাচ্ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভাঙেন ফজলহক ফারুকি। হেটমায়ারকে ফিরিয়ে দিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্রেকথ্রু এনে দেন।
এরপরই মুজিব উর রহমানের স্পেলে নেমে আসে ঝড়। নিজের ওভারে একের পর এক উইকেট তুলে নিয়ে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন এই অফস্পিনার। ১৬তম ওভারের প্রথম বলে ব্র্যান্ডন কিংকে আউট করে হ্যাটট্রিক সম্পন্ন করেন তিনি। কিং ৪১ বলে ২টি চার ও ৪টি ছক্কায় ৫০ রান করেছিলেন। নতুন ব্যাটার কুইন্টন স্যাম্পসন প্রথম বলে ২ রান নিলেও পরের বলেই বোল্ড হয়ে যান। মুজিব শেষ করেন ২১ রানে ৪ উইকেট নিয়ে। টানা পাঁচ বলে চার উইকেট শিকার করে তিনি ম্যাচের নিয়তি একপ্রকার ঠিক করে দেন।
মুজিবের সঙ্গে দারুণভাবে সঙ্গ দেন রশিদ খান ও আজমতুল্লাহ ওমরজাই। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শেষ পর্যন্ত ১৮.৫ ওভারে ১৫০ রানে অলআউট হয়ে যায় তারা। ফারুকি ও ওমরজাই নেন দুটি করে উইকেট, রশিদ খান শিকার করেন একটি।
এই জয়ের মাধ্যমে আফগানিস্তান শুধু সিরিজ জয়ই নিশ্চিত করেনি, বরং ক্রিকেট বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে তারা আর কোনো দলের জন্যই সহজ প্রতিপক্ষ নয়। রশিদ খান, মুজিব উর রহমান, নূর আহমদের মতো স্পিন আক্রমণ এবং ব্যাটিংয়ে নতুন প্রজন্মের দৃঢ়তা আফগানিস্তানকে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ভয়ংকর দলে পরিণত করেছে। আজ রাতে তৃতীয় ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হোয়াইটওয়াশ করার সুযোগ রয়েছে তাদের সামনে। সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারলে আফগানিস্তানের আত্মবিশ্বাস আরও কয়েক ধাপ বেড়ে যাবে, আর বিশ্বকাপের আগে প্রতিপক্ষদের জন্য সতর্কবার্তাও আরও জোরালো হবে।