প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সংক্ষেপে রুয়েট—বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যাপীঠ। সেই রুয়েটের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা আজ বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে। সকাল সাড়ে ৯টায় একযোগে রাজশাহী ও ঢাকায় এই পরীক্ষা শুরু হয়। এবারই প্রথমবারের মতো রুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট কেন্দ্রেও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে একদিকে পরীক্ষার্থীদের চাপ সামাল দেওয়া সহজ হয়েছে, অন্যদিকে দেশের দুই ঐতিহ্যবাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এক নতুন সমন্বয়ের দৃষ্টান্তও তৈরি হয়েছে।
রুয়েটের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ও ভর্তি পরীক্ষা কমিটির সদস্যসচিব আরিফ আহম্মদ চৌধুরী জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী রুয়েট ও বুয়েট—উভয় কেন্দ্রে একযোগে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। নিরাপত্তা, পরীক্ষার পরিবেশ এবং পরীক্ষার্থীদের সার্বিক সহযোগিতায় প্রশাসনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সক্রিয় রয়েছে।
ভোর থেকেই রুয়েট ক্যাম্পাসে দেখা যায় ভিন্ন রকম এক উত্তেজনা। সকাল ৮টা থেকে পরীক্ষার্থীরা দলে দলে ক্যাম্পাসে আসতে শুরু করেন। অনেকের সঙ্গে ছিলেন তাঁদের বাবা-মা বা অভিভাবকেরা। কারও চোখে স্বপ্ন, কারও চোখে দুশ্চিন্তা, আবার কারও চোখে আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে রুয়েট প্রাঙ্গণে তৈরি হয় আবেগঘন এক পরিবেশ। সকাল সাড়ে ৯টার কিছু আগে পরীক্ষার্থীরা নিজ নিজ হলে প্রবেশ করলে ক্যাম্পাসের বাইরের এলাকায় অপেক্ষা করতে থাকেন অভিভাবকেরা। এ সময় রুয়েটের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়, যা কিছু সময় ভোগান্তির কারণ হলেও প্রশাসনের তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
রুয়েট সূত্রে জানা গেছে, এবারের ভর্তি পরীক্ষায় পুরকৌশল, তড়িৎ ও কম্পিউটার কৌশল এবং যন্ত্রকৌশল অনুষদের আওতায় মোট ১৪টি বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। এসব বিভাগে মোট আসন সংখ্যা ১ হাজার ২৩৫টি। এই আসনের বিপরীতে আবেদন করেছেন ১৮ হাজার ২৭৭ জন শিক্ষার্থী। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি আসনের জন্য গড়ে প্রায় ১৪ দশমিক ৭৯ জন পরীক্ষার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রকৌশল শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ এবং রুয়েটের প্রতি আস্থার প্রতিফলন হিসেবেই এই প্রতিযোগিতাকে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে ক ও খ—দুটি গ্রুপে। ক গ্রুপের পরীক্ষার্থীরা রাজশাহীতে রুয়েট কেন্দ্রে এবং ঢাকায় বুয়েট কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছেন। রুয়েট কেন্দ্রে ক গ্রুপে অংশ নিচ্ছেন ৮ হাজার ৪৭৭ জন শিক্ষার্থী, আর বুয়েট কেন্দ্রে পরীক্ষার্থী সংখ্যা ৯ হাজার ৮০০ জন। পরীক্ষা সকাল ৯টায় শুরু হয়ে দুপুর ১২টায় শেষ হয়। প্রশ্নপত্র ছিল এমসিকিউ পদ্ধতিতে। তবে রুয়েট কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়া ৬৭০ জন পরীক্ষার্থী মুক্তহস্ত অঙ্কন পরীক্ষার জন্য অতিরিক্ত এক ঘণ্টা সময় পান। তাঁদের পরীক্ষা দুপুর সোয়া ১২টা থেকে বেলা সোয়া ১টা পর্যন্ত চলে।
বিভাগভিত্তিক আসন বণ্টন অনুযায়ী, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং—এই চারটি বিভাগে সর্বোচ্চ ১৮০টি করে আসন রয়েছে। এ ছাড়া আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং, ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং, সিরামিক অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং—এসব বিভাগে ৬০টি করে আসন রয়েছে। আর্কিটেকচার, বিল্ডিং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্ট এবং কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে রয়েছে ৩০টি করে আসন। এর বাইরে সংরক্ষিত আসন হিসেবে মোট ৫টি আসন রাখা হয়েছে, যার মধ্যে বান্দরবান জেলার অধিবাসীদের জন্য একটি এবং পার্বত্য জেলা ও অন্যান্য এলাকার উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃগোষ্ঠীর জন্য চারটি আসন নির্ধারিত।
এবারের ভর্তি পরীক্ষায় মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশ্নে বরাদ্দ নম্বরের ২৫ শতাংশ কেটে নেওয়া হবে। ফলে আন্দাজে উত্তর দেওয়ার সুযোগ কমে গেছে, যা প্রকৃত মেধাবীদের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে বলে মনে করছেন শিক্ষক ও শিক্ষা বিশ্লেষকেরা।
পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে এই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন। কেউ কোচিং সেন্টারে, কেউবা নিজ উদ্যোগে পড়াশোনা করে আজকের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। অনেক শিক্ষার্থী জানান, রুয়েটের শিক্ষার মান, আবাসিক পরিবেশ এবং ক্যাম্পাস সংস্কৃতি তাঁদের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। অন্যদিকে অভিভাবকেরাও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হলেও অপেক্ষার প্রহর কাটাচ্ছেন দুশ্চিন্তা আর দোয়ায়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হতে পারে। ফল প্রকাশের পর মেধাক্রম ও কোটা অনুযায়ী ভর্তি প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ শুরু হবে। রুয়েট কর্তৃপক্ষ আশাবাদী, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে পুরো ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
প্রকৌশল শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যে অল্প কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে আস্থা ও সুনাম ধরে রেখেছে, রুয়েট তাদের অন্যতম। প্রতিবছরের মতো এবারও ভর্তি পরীক্ষাকে ঘিরে যে ব্যাপক সাড়া ও প্রতিযোগিতা দেখা গেছে, তা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থারই প্রমাণ। আজকের পরীক্ষার মাধ্যমে হাজারো তরুণের স্বপ্নের প্রথম ধাপ পেরোনোর লড়াই শুরু হলো। কার ভাগ্যে জুটবে রুয়েটের সবুজ ক্যাম্পাসে পড়ার সুযোগ—সেই অপেক্ষায় এখন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সবাই।