প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে নৃশংসভাবে খুন হওয়া ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগ ওরফে লাল চাঁদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই নির্মম হত্যার সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ্যে আসার পর জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ঠিক এমন সময়, এই ঘটনায় এক ব্যতিক্রমী ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জানালেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম, ঢাকা বার ইউনিট।
বিএনপিপন্থি এই আইনজীবী সংগঠন সোমবার (১৪ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সোহাগ হত্যার ঘটনায় যেসব ব্যক্তি অভিযুক্ত, তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী আদালতে দাঁড়াবেন না। সংগঠনটি আরও স্পষ্ট করে জানায়, হত্যাকাণ্ডটি যে বর্বরতা ও মানবতাবিরোধী নিষ্ঠুরতার প্রতীক, তাতে কোনোভাবেই ন্যায়বিচারবিরোধী অবস্থান নেওয়া সম্ভব নয়।
সোহাগ হত্যার পেছনে বিএনপিকে জড়ানোর যে চেষ্টা চালানো হয়েছে, তা নিয়েও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সংগঠনটি। বিবৃতিতে বলা হয়, দেশে দীর্ঘ সময় ধরে ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের শিকার একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি যেভাবে নির্যাতিত হয়ে এসেছে, তাতে এমন ঘৃণ্য অপরাধের দায় তাদের ঘাড়ে চাপানো কেবল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এক নির্লজ্জ প্রচেষ্টা।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম মনে করে, এ ঘটনা নিয়ে যেভাবে সামাজিক মাধ্যমে ও কিছু প্রচারমাধ্যমে বিএনপিকে দায়ী করার অপচেষ্টা চলছে, তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। তাদের মতে, তদন্ত না করে বা প্রকৃত তথ্য প্রমাণ ছাড়াই একতরফাভাবে দায় চাপানোর সংস্কৃতি শুধু একটি দলকে হেয় করতেই নয়, বরং বিচারপ্রক্রিয়াকেই দুর্বল করে তোলে।
বিশেষ করে, এই বিবৃতিতে তুলে ধরা হয় গত কয়েকদিনে ঘটে যাওয়া কয়েকটি অমানবিক ঘটনার প্রসঙ্গ। খুলনায় যুবদল নেতা হত্যাসহ চাঁদপুরে এক মসজিদের ইমামকে কুপিয়ে হত্যা এবং ঢাকার আলোচিত সোহাগ হত্যাকাণ্ড তাদের মতে, একটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। তারা দাবি করেন, এসব ঘটনার দায় অযথাভাবে বিএনপির ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, যার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে।
তবে এ সব বক্তব্যের বাইরে গিয়েও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম তাদের অবস্থান ব্যতিক্রমভাবে ব্যাখ্যা করেছে। তারা বলেছে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং হত্যার বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে তারা সোহাগ হত্যা মামলায় আসামিদের কোনো আইনি সহায়তা দেবেন না। এটি কেবল আইনি সিদ্ধান্ত নয়, বরং নৈতিক অবস্থান।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন কোনো আইনজীবী যেন আসামিপক্ষে না দাঁড়ায়, সে বিষয়ে আহ্বান জানানো হয়েছে সংগঠনের পক্ষ থেকে। এমনকি ভবিষ্যতে যাতে বিএনপিপন্থি কোনো আইনজীবী এই মামলায় যুক্ত না হন, তা নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
সোহাগ হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে। ফুটেজে দেখা যায়, দিবালোকে, জনসমক্ষে একাধিক ব্যক্তি সোহাগকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করছে। হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, রাজধানীবাসী এই ঘটনায় রীতিমতো স্তব্ধ হয়ে গেছে।
যে পরিস্থিতিতে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে এবং যেভাবে একজন সাধারণ ব্যবসায়ীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা নিয়ে আইনজীবী সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এই অবস্থায় বিএনপিপন্থি আইনজীবী সংগঠনের এমন সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে নজিরবিহীন বলেই মনে হচ্ছে।
দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং মানবিক মূল্যবোধের পক্ষ থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রাজনীতি যাই থাকুক, হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়ে দাঁড়ানোই গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাস্থ্যবান পরিচয়।
এখন সবার নজর মামলার তদন্তের দিকে। আইনি প্রক্রিয়ায় সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত আসামিদের গ্রেফতার এবং প্রমাণিত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই হতে পারে সোহাগের পরিবারের প্রতি ন্যূনতম ন্যায়বিচার। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের অবস্থান সেই ন্যায়বিচারের দাবিকে একধাপ এগিয়ে দিল বলেই মত অনেকের।