দাভোসে ট্রাম্পের বক্তব্যে একাধিক তথ্য বিকৃতি ও মিথ্যা দাবি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৬ বার
দাভোসে ট্রাম্পের বক্তব্যে একাধিক তথ্য বিকৃতি ও মিথ্যা দাবি

প্রকাশ: ২২  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মঞ্চে ইউরোপীয় মিত্রদের কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার দেওয়া বক্তব্যে তিনি শুধু ন্যাটো ও ইউরোপের সামরিক ব্যয় নিয়েই প্রশ্ন তোলেননি, বরং গ্রিনল্যান্ড দখলের ইঙ্গিত দিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। একই সঙ্গে অর্থনীতি, সামরিক জোট ও নিজের শাসনামলের সাফল্য নিয়ে তিনি এমন কিছু দাবি করেছেন, যা তথ্য যাচাই করলে বিভ্রান্তিকর কিংবা সরাসরি মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য ছিল পুরোনো অভিযোগ ও অতিরঞ্জিত দাবির পুনরাবৃত্তি, যেখানে ইতিহাস ও বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই এমন তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

দাভোসের বক্তব্যে ট্রাম্প দাবি করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র নাকি ডেনমার্ককে গ্রিনল্যান্ড ফিরিয়ে দিয়েছিল এবং এটিকে তিনি ‘বোকামি সিদ্ধান্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু ইতিহাসবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বক্তব্য সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানি ডেনমার্ক দখল করলে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়, যার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই চুক্তি কখনোই যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব দেয়নি।

১৯৪১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ডেনিশ রাষ্ট্রদূত ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন, যা ছিল মূলত গ্রিনল্যান্ডকে নাৎসি আগ্রাসন থেকে রক্ষার একটি সাময়িক ব্যবস্থা। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক স্টিভেন প্রেস বলেন, এই চুক্তি আইনি দিক থেকে দুর্বল ছিল, কারণ ডেনমার্কের নির্বাচিত সরকার তখন দখলদার বাহিনীর কবলে ছিল। তবুও চুক্তিতে স্পষ্টভাবে গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত ছিল।

ডেনিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক মিকেল রুঞ্জ ওলেসেন বলেন, ওই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কেবল সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অধিকার পেয়েছিল, দ্বীপটির মালিকানা নয়। চুক্তির একাধিক অনুচ্ছেদে গ্রিনল্যান্ডকে ডেনমার্কের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকার সেখানে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অঙ্গীকার করেছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে শক্তি প্রয়োগ করে গ্রিনল্যান্ড দখল করতে পারত, কিন্তু তার কোনো আইনি ভিত্তি থাকত না। অধ্যাপক প্রেসের ভাষায়, ‘জোর যার মুল্লুক তার’—এই নীতির বাইরে আন্তর্জাতিক আইনে গ্রিনল্যান্ড দখলের কোনো বৈধতা যুক্তরাষ্ট্রের ছিল না।

ন্যাটোর সামরিক ব্যয় নিয়েও ট্রাম্প একাধিক ভুল দাবি করেন। তিনি বলেন, তাঁর ক্ষমতায় আসার আগে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো প্রতিরক্ষা খাতে কোনো অর্থই ব্যয় করত না এবং যুক্তরাষ্ট্রকেই প্রায় পুরো ব্যয় বহন করতে হতো। বাস্তবে ন্যাটো একটি যৌথ সামরিক জোট, যেখানে প্রতিটি দেশ নিজ নিজ সামরিক বাজেট নিজেই বহন করে এবং জোটের কেন্দ্রীয় বাজেটে সদস্যদেশগুলো নির্ধারিত হারে অবদান রাখে।

২০১৪ সালে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো সিদ্ধান্ত নেয়, ১০ বছরের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ ব্যয় করা হবে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অগ্রগতি হলেও তা শুরু হয়েছিল তাঁর আগেই। ২০১৬ সালে মাত্র চারটি দেশ এই লক্ষ্য পূরণ করলেও ২০২০ সালে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় আটে। ২০২৪ সালে ১৮টি এবং ২০২৫ সালের মধ্যে ৩১টি দেশ এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনই সামরিক ব্যয় বাড়ানোর প্রধান কারণ, ট্রাম্পের চাপ নয়।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, তিনি ন্যাটোর দেশগুলোকে জিডিপির ৫ শতাংশ সামরিক ব্যয়ে রাজি করিয়েছেন এবং তারা এখন তা দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত কোনো দেশই এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। এমনকি ন্যাটো কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, ৫ শতাংশ ব্যয় এখনো কেবল একটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সুবিধা পায়নি—ট্রাম্পের এই দাবিও তথ্যগতভাবে ভুল। ন্যাটো তাদের ইতিহাসে মাত্র একবারই ‘আর্টিকেল ৫’ কার্যকর করেছে, আর তা ছিল ২০০১ সালের নাইন ইলেভেন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে। এরপর আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার সেনা অংশ নেয়। শুধু ডেনমার্কই পাঠিয়েছিল ১৮ হাজার সেনা, যাদের মধ্যে ৪৩ জন প্রাণ হারান।

দাভোসে ট্রাম্প আরও কিছু বিতর্কিত দাবি করেন, যেগুলো আগে থেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যাচাই করে ভুল বলে প্রমাণ করেছে। তিনি দাবি করেন, তাঁর শাসনামলে ১৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে, যা বাস্তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিশ্চিত প্রতিশ্রুতির সমষ্টি মাত্র। সামাজিক নিরাপত্তা কর পুরোপুরি বাতিল করেছেন বলেও তিনি দাবি করেন, যদিও বাস্তবে তা কেবল আংশিকভাবে কমানো হয়েছে।

চীনে কোনো বায়ুকল নেই—এই বক্তব্যও বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চীনেরই। ইউক্রেনে সহায়তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ৩৫০ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে বলেও ট্রাম্প দাবি করেন, অথচ সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রকৃত অঙ্ক তার প্রায় অর্ধেক।

বিশ্বজুড়ে আটটি যুদ্ধ থামানোর দাবি, মুদিপণ্যের দাম কমে আসা কিংবা ওষুধের দাম কয়েকশ শতাংশ কমে যাওয়ার বক্তব্যও তথ্যপ্রমাণে টেকে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব বক্তব্য রাজনৈতিক বার্তা তৈরির অংশ হলেও বাস্তব তথ্যের সঙ্গে এর বড় ধরনের ফারাক রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দাভোসের মতো একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে এমন বিভ্রান্তিকর বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে এটি বিশ্ব রাজনীতিতে তথ্যভিত্তিক আলোচনার গুরুত্ব নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত