রাঙামাটি থেকে ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে বাস বন্ধ, ভোগান্তিতে যাত্রীরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৮ বার
রাঙামাটি থেকে ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে বাস বন্ধ, ভোগান্তিতে যাত্রীরা

প্রকাশ: ২২  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পার্বত্য জেলা রাঙামাটি থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে দূরপাল্লার বাস চলাচল হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে এসব রুটে কোনো বাস ছেড়ে না যাওয়ায় কর্মস্থলগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও পর্যটকদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। বাস চলাচল বন্ধ থাকায় পুরো জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাঙামাটি শহরের ফিশারিঘাট বাস টার্মিনালে সারি সারি বাস দাঁড়িয়ে আছে। ইঞ্জিন বন্ধ, ভেতরে কোনো যাত্রী নেই। বাসচালক ও চালকের সহকারীরা অলস সময় পার করছেন। কেউ বাসের পাশে বসে আড্ডা দিচ্ছেন, কেউবা আশপাশের চায়ের দোকানে সময় কাটাচ্ছেন। অথচ যাত্রীদের ভিড় নেই বললেই চলে। যারা দূরদূরান্ত থেকে টার্মিনালে এসেছিলেন, বাস চলাচল বন্ধের খবর পেয়ে হতাশ মুখে ফিরে যাচ্ছেন।

বাস চলাচল বন্ধের খবরে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন জরুরি প্রয়োজনে ভ্রমণ করতে আসা যাত্রীরা। চট্টগ্রামে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাস টার্মিনালে আসা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, তিনি সকালে নির্ধারিত কাজের জন্য চট্টগ্রামে রওনা হওয়ার কথা ছিল। টার্মিনালে এসে জানতে পারেন, আজ কোনো বাস ছাড়বে না। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে কোনো পূর্বঘোষণা না থাকায় যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। অনেকেই সময় ও অর্থ—দুটোই নষ্ট করছেন।

বাস চলাচল বন্ধ থাকার পেছনের কারণ হিসেবে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-রাঙামাটি বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়ন এবং মালিক সমিতির যৌথ উদ্যোগে এই ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। শ্রমিক ইউনিয়নের সহসাধারণ সম্পাদক মো. ইউছুপ জানান, হঠাৎ করে নিয়ম না মেনে রাঙামাটি-ঢাকা রুটে সৌদিয়া পরিবহনের বাস চালু করায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সমিতির সঙ্গে আলোচনা বা সমন্বয় না করেই নতুন বাস চালু করা হয়, যা দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়মের পরিপন্থী।

অন্যদিকে, সৌদিয়া পরিবহনের পক্ষ থেকে ভিন্ন কথা বলা হচ্ছে। রাঙামাটির রিজার্ভ বাজারে অবস্থিত সৌদিয়া বাস কাউন্টারের ম্যানেজার মো. আরমান জানান, তারা সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই রাঙামাটি-ঢাকা রুটে বাস চালু করেছিলেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মোটর মালিক সমিতির অনুমতি, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও বিআরটিএর অনুমোদনসহ সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পরই এসি ও নন-এসি দুটি বাস চালু করা হয়। শুরুতে এসব বাস নিয়মিত চলাচল করছিল এবং যাত্রীদের কাছেও ভালো সাড়া মিলেছিল।

তবে পরিস্থিতি হঠাৎ পাল্টে যায় গতকাল। মো. আরমানের অভিযোগ, রাউজান ও রাঙামাটি থেকে আসা চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মোটর মালিক সমিতির কিছু লোক এসে সৌদিয়া বাসের টিকিট বিক্রি বন্ধ রাখতে বলেন। শুধু তাই নয়, সৌদিয়া কাউন্টারের অফিসেও হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, এই ধরনের আচরণ শুধু একটি পরিবহন প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, পুরো জেলার যাত্রীসেবার জন্যই ক্ষতিকর।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মোটর মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী আনিসুর জামান বলেন, সৌদিয়া পরিবহনের সঙ্গে তাঁদের সমিতির একটি মামলা চলমান ছিল এবং সেই মামলায় আদালত সমিতির পক্ষে রায় দিয়েছেন। তাঁর দাবি, আদালতের রায়ের সিদ্ধান্ত না মেনেই সৌদিয়া পরিবহন রাঙামাটি থেকে ঢাকা রুটে বাস চালু করে। একাধিকবার অনুরোধ করা হলেও তারা বাস চলাচল বন্ধ করেনি। ফলে বাধ্য হয়েই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

এই বিরোধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। যাত্রীদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও পর্যটকরাও বিপাকে পড়েছেন। রাঙামাটি একটি পর্যটননির্ভর জেলা হওয়ায় বাস চলাচল বন্ধ থাকলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অনেক পর্যটক আগে থেকেই বুকিং করা থাকলেও গন্তব্যে যেতে না পেরে পরিকল্পনা বাতিল করছেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাঙামাটি জেলা শাখার সম্পাদক এম জিসান বখতেয়ার এ পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের তুচ্ছ দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে বাস চলাচল বন্ধ রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এতে সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়ে। আধুনিক ও নিরাপদ যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে হলে সব ধরনের যান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সমিতির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রাখা গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার পরিপন্থী।

তিনি আরও বলেন, এই ধরনের সংকট নিরসনে জেলা প্রশাসন ও সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। আইনি ও প্রশাসনিক সমাধান ছাড়া বারবার ধর্মঘট ডাকা হলে জনভোগান্তি বাড়বে এবং পরিবহন খাতের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারাও এই অচলাবস্থার দ্রুত সমাধান চান। তাঁদের মতে, মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব বা সমিতির বিরোধের দায় সাধারণ যাত্রীদের বহন করা উচিত নয়। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের মতো দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

সব মিলিয়ে, রাঙামাটি থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম রুটে বাস চলাচল বন্ধ থাকার ঘটনায় যাত্রীদের দুর্ভোগ যেমন প্রকট হয়ে উঠেছে, তেমনি পরিবহন ব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যাও নতুন করে সামনে এসেছে। দ্রুত সমাধান না এলে এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত