রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ধাক্কা, ইউরোপে কমছে পোশাক রফতানি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬১ বার
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ধাক্কা, ইউরোপে কমছে পোশাক রফতানি

প্রকাশ:  ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত আবারও চাপের মুখে পড়েছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নীতিগত স্থবিরতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থাহীনতার প্রভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে টানা দুই মাস ধরে কমেছে বাংলাদেশি পোশাকের রফতানি আয়। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, এই নেতিবাচক প্রবণতা শুধু মাসভিত্তিক নয়, বরং সামনে মোট হিসাবেও রফতানি আয়ের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে—এমন শঙ্কা প্রকাশ করছেন খাত সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকেরা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ দেশের জোটের বাজারে গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ থেকে রফতানি হওয়া তৈরি পোশাকের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩৭ কোটি ডলার। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০.৮৭ শতাংশ কম। এর আগে অক্টোবর মাসেও রফতানি আয় কমেছিল ১৯.৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ পরপর দুই মাস ইউরোপের বাজারে উল্লেখযোগ্য হারে রফতানি কমার ঘটনা ঘটেছে, যা খাতটির জন্য একটি স্পষ্ট সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যদিও সামগ্রিক চিত্র এখনো পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসের যোগফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশি পোশাক রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫.১৩ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু রফতানিকারকদের আশঙ্কা, এই সাময়িক প্রবৃদ্ধি খুব দ্রুতই ‘তৃপ্তির ঢেঁকুর’ থেকে ‘গলার কাঁটা’তে পরিণত হতে পারে। কারণ বছরের শেষ ভাগে ধারাবাহিক পতন চলতে থাকলে মোট হিসাবেও এর নেতিবাচক প্রতিফলন ঘটবে।

শুধু ইউরোপ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও উদ্বেগজনক ইঙ্গিত মিলছে। মার্কিন বাজারে গত অক্টোবরে প্রথমবারের মতো বছর ব্যবধানে মাসভিত্তিক রফতানি আয় কমেছে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের। দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি দেখানো এই বাজারে হঠাৎ করে এমন পতন রফতানিকারকদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক দুই প্রধান বাজারেই যখন একই সময়ে চাপ তৈরি হচ্ছে, তখন গোটা খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মুস্তাজিরুল শোভন ইসলাম বলেন, সারা বছর ধরেই দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা লেগে ছিল এবং তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক থাকা কঠিন। তাঁর ভাষায়, “এই মুহূর্তে ব্যবসা নাজুক অবস্থায় রয়েছে। রফতানি কমছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সামনের দিনগুলোতেও প্রবৃদ্ধি কমতেই থাকবে।”

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব শুধু দেশের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ নয়; এর সরাসরি প্রতিফলন পড়ছে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে। উদ্যোক্তারা বলছেন, বৈশ্বিক বাজার এখন সংকুচিত, প্রতিযোগিতা তীব্র, আর ক্রেতারা ঝুঁকি হিসাব করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। মুস্তাজিরুল শোভন ইসলাম জানান, অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা বাংলাদেশকে বর্তমানে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশ হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে তারা তুলনামূলক বেশি দাম দিয়েও ভিয়েতনাম, ভারত বা অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ থেকে পোশাক সংগ্রহ করতে আগ্রহী হচ্ছে। এতে বাংলাদেশের বাজার অংশীদারত্ব হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উদ্যোক্তাদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণে শুধু বাজার পরিস্থিতির উন্নতির অপেক্ষা করলেই হবে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক সরকারের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও কৌশলগত পদক্ষেপ। স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা ফেরানো ছাড়া সংকুচিত হতে থাকা বাজারে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন। ক্রয়াদেশের ধরন বিশ্লেষণ করলেও স্পষ্ট বোঝা যায়, ক্রেতারা এখন আগের তুলনায় বেশি সতর্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্ডার দিতে অনীহা প্রকাশ করছে।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসানও একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ক্রেতাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি গ্রহণযোগ্য সরকার প্রয়োজন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক বৈধতা নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নত হবে এবং রফতানি আয়ও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

এদিকে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-এর তথ্য আরও স্পষ্ট করে তুলছে চিত্রটি। সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে জুলাই মাস ছাড়া প্রায় প্রতিটি মাসেই দেশের মোট রফতানি আয় কমেছে। অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত রফতানি খাতে এমন ধারাবাহিক পতন সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকটকে শুধু সাময়িক মন্দা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বৈশ্বিক অর্থনীতির চাপে থাকা, ইউরোপ ও আমেরিকার ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়া এবং একই সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা—এই সবকিছু মিলেই বাংলাদেশের পোশাক খাতকে কঠিন সময়ের মুখে ফেলেছে। তবে সময়োচিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলেও তারা মনে করেন।

সব মিলিয়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান বাজারে রফতানি আয় কমে যাওয়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতিগত স্পষ্টতা এবং আন্তর্জাতিক আস্থা পুনরুদ্ধার—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা না গেলে সংকট আরও গভীর হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, নীতিনির্ধারকেরা কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় এগিয়ে আসেন এবং এই গুরুত্বপূর্ণ খাতকে আবারও প্রবৃদ্ধির পথে ফেরাতে পারেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত