কার্ডের লোভে ভোট প্রভাবিতের অভিযোগ জামায়াত আমিরের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬০ বার
কার্ডের লোভে ভোট প্রভাবিতের অভিযোগ জামায়াত আমিরের

প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের প্রভাবিত করতে ১০ টাকা কেজি চালের মতো নানা ধরনের ‘কার্ডের লোভ’ দেখানো হচ্ছে—এমন গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি দাবি করেছেন, জনগণের মৌলিক ভোটাধিকারকে প্রভাবিত করার জন্য পরিকল্পিতভাবে সুবিধা ও প্রলোভনের রাজনীতি করা হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের চেতনাবিরোধী। শুক্রবার সকালে উত্তরাঞ্চলে নির্বাচনী জনসভায় যোগ দিতে যাওয়ার আগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী কখনোই মানুষকে কেনার রাজনীতি করে না। তাঁর ভাষায়, “আমরা মানুষকে কেনার চিন্তা করি না। আমরা মানুষের জীবনের প্রতি সম্মান দেখাই।” তিনি অভিযোগ করেন, যারা নিজেরাই ভোটকে প্রভাবিত করার নানা কৌশল অবলম্বন করে, তারাই এখন সেই দায় অন্যদের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, ১০ টাকা কেজি চালের স্মৃতি টেনে এনে নতুন নতুন কার্ড ও সুবিধার প্রলোভন দেখানো হচ্ছে, এমনকি কোথাও কোথাও ভোটারদের হাতে তাৎক্ষণিকভাবে ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও শোনা যাচ্ছে। তিনি এসব কর্মকাণ্ডকে ‘চোরাপথে’ ভোটের বৈধ অধিকার প্রভাবিত করার চেষ্টা বলে আখ্যা দেন এবং বলেন, জামায়াত এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঘৃণা করে।

জামায়াত আমিরের বক্তব্যে উঠে আসে নৈতিক রাজনীতির প্রশ্ন। তিনি বলেন, ভোট একটি পবিত্র অধিকার ও দায়িত্ব, যা কোনো ধরনের আর্থিক বা বস্তুগত প্রলোভনের বিনিময়ে ক্ষুণ্ন করা উচিত নয়। তাঁর মতে, জনগণের সম্মান ও স্বাধীন সিদ্ধান্তের ওপর আঘাত হেনে যে কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা হারায়। এ সময় তিনি ভোটারদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান এবং বলেন, কার্ড বা সুবিধার লোভে পড়ে নিজেদের অধিকার বিসর্জন দেওয়া জাতির ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর।

সরকার গঠনের সুযোগ পেলে কী ধরনের উন্নয়ন দর্শন বাস্তবায়ন করা হবে—সে বিষয়েও বক্তব্য দেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জামায়াত কোনো মিথ্যা স্বপ্ন বা অলীক প্রতিশ্রুতি দেয় না। জনগণের ভোট, ভালোবাসা ও সমর্থনে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে বাস্তবতার ভিত্তিতে, যুক্তিসংগত পরিকল্পনার মাধ্যমে ইনসাফভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। তাঁর কথায়, “দেশের জনগণের যে সম্পদ, সেই সম্পদ দিয়েই আমরা উন্নয়ন এবং সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেব।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, উন্নয়নের নামে অপচয় বা অযৌক্তিক প্রকল্প নয়, বরং মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন ও ন্যায্যতার ওপর ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে পোস্টাল ব্যালটের বিষয়টিও তুলে ধরেন জামায়াত আমির। তিনি জানান, পোস্টাল ব্যালট পাঠানো শুরু হলেও অনেক জায়গায় তা এখনও পৌঁছায়নি, অথচ সময় দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, যথাযথ উদ্যোগ নিয়ে নিশ্চিত করতে হবে যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ব্যালট ভোট নিয়ে ফিরে আসে। অন্যথায় এটি জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারলে প্রবাসী ও দূরবর্তী এলাকার ভোটারদের একটি বড় অংশ বঞ্চিত হবে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্দেশেও বিশেষ আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, যা শক্তভাবে কার্যকর হলে বিদেশে বসবাসরত নাগরিকদের নানা ধরনের বঞ্চনার প্রতিকারে বড় ভূমিকা রাখবে। তিনি প্রবাসীদের অনুরোধ করেন, তারা যেন ভয় বা সংশয় ছাড়াই নিজেদের পছন্দের প্রার্থী বা দলকে ভোট দেন। তাঁর ভাষায়, “আপনার ভোটই নির্ধারণ করে দেবে আগামী দিনে এই দেশ কে পরিচালনা করবে।” তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, কোনো কোনো আসনে একটি ভোটই ব্যবধান গড়ে দিতে পারে; তাই ভোট না দিলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নাও আসতে পারে।

ভোটের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ভোট শুধু একটি অধিকার নয়, এটি একটি পবিত্র দায়িত্বও। অধিকার ও দায়িত্ব—এই দুটিই একসঙ্গে পালন করতে হবে। তিনি ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান, অবহেলা বা হতাশার কারণে ভোটদান থেকে বিরত না থেকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে। তাঁর মতে, গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে সচেতন নাগরিকদের অংশগ্রহণে।

গণভোট প্রসঙ্গেও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি জানান, রাজনীতিতে যারা বড় ধরনের পরিবর্তন চান, তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলবেন। তাঁর মতে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত সরাসরি প্রতিফলিত হলে রাজনৈতিক সংস্কারের পথ সুগম হবে। তিনি বলেন, জামায়াত ঐক্যবদ্ধভাবে জাতি গঠনে বিশ্বাস করে এবং সে কারণেই এককভাবে নয়, বরং দেশপ্রেমিক ও ইসলামী দলগুলোর সমন্বয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, কিছু ব্যতিক্রম থাকতে পারে, তবে সামগ্রিকভাবে তাদের লক্ষ্য একক দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়া। জাতিকে তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, একা নয়—সবাই মিলে দেশ গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁর মতে, দলীয় বিভাজন ও সংকীর্ণতার বাইরে এসে জাতীয় ঐক্যই পারে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট কাটিয়ে তুলতে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত আমিরের এই বক্তব্য নির্বাচনী মাঠে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। ভোট প্রভাবিত করার অভিযোগ, কার্ডভিত্তিক সুবিধা বিতরণ এবং নৈতিক রাজনীতির প্রশ্ন—সব মিলিয়ে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হতে পারে। একই সঙ্গে পোস্টাল ব্যালট ও প্রবাসী ভোটাধিকার নিয়ে তার মন্তব্য নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ও প্রস্তুতির দিকটি নতুন করে সামনে এনেছে।

সব মিলিয়ে, ১০ টাকা কেজি চালের মতো কার্ডের লোভ দেখানোর অভিযোগ এনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান নির্বাচনী রাজনীতিতে নৈতিকতার প্রশ্নটি জোরালোভাবে সামনে এনেছেন। তাঁর বক্তব্য সমর্থক ও সমালোচক—দুই পক্ষের মধ্যেই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। আসন্ন নির্বাচনে এসব অভিযোগ ও বক্তব্য কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে ভোটারদের সচেতনতা, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত