পারিবারিক বিরোধে লাঠির আঘাতে মামার মৃত্যু, ভাগনে আটক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৫ বার
পারিবারিক বিরোধে লাঠির আঘাতে মামার মৃত্যু, ভাগনে আটক

প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় পারিবারিক বিরোধের জেরে সংঘটিত এক সহিংস ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন এক বৃদ্ধ। বাঁশের লাঠির আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন খায়রুল হক (৬৫)। এ ঘটনায় নিহতের ভাগনে আনিছুর রহমানকে (৪৮) আটক করেছে পুলিশ। স্থানীয়ভাবে ঘটনাটি নিয়ে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, একই সঙ্গে পারিবারিক দ্বন্দ্ব থেকে কীভাবে এমন মর্মান্তিক পরিণতি আসে—তা নিয়ে নানা প্রশ্নও উঠছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটি ঘটেছে উলিপুর উপজেলার বজরা ইউনিয়নের টিটামারপাড়া এলাকায়। বুধবার বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে খায়রুল হক ও তাঁর ভাগনে আনিছুর রহমানের মধ্যে পারিবারিক বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে বাকবিতণ্ডা হলেও একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে আনিছুর রহমান হাতে থাকা বাঁশের লাঠি দিয়ে খায়রুল হকের মাথায় সজোরে আঘাত করেন। আঘাতের তীব্রতায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং অচেতন হয়ে যান।

স্বজনেরা দ্রুত আহত খায়রুল হককে উদ্ধার করে উলিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁর অবস্থাকে গুরুতর হিসেবে চিহ্নিত করেন। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন বিবেচনায় তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হলেও তাঁর অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। অবশেষে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

নিহত খায়রুল হক ছিলেন স্থানীয়ভাবে পরিচিত একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি। পরিবার ও প্রতিবেশীরা জানান, তিনি শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন এবং একই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছিলেন। অভিযুক্ত আনিছুর রহমান তাঁর আপন ভাগনে এবং তারাও একই এলাকায় থাকতেন। পারিবারিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও এমন সহিংস পরিণতি স্থানীয়দের মধ্যে গভীর বেদনা ও বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল এলাকায় তদন্ত শুরু করে। নিহতের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ টহল জোরদার করে। ঘটনার পরদিন বিকেলে অভিযান চালিয়ে পুলিশ অভিযুক্ত আনিছুর রহমানকে আটক করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

উলিপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুল আলম জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত ভাগনেকে আটক করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, “পারিবারিক বিরোধের জেরে এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত মামলাটি নথিভুক্ত করা হবে। পুলিশ আরও জানায়, ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ ও পূর্বের কোনো বিরোধ ছিল কি না—সেগুলোও তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে।

এদিকে, নিহতের পরিবার শোকে ভেঙে পড়েছে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, সামান্য পারিবারিক বিষয় নিয়েই এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছিল, যা তারা কখনোই এত বড় বিপর্যয়ে রূপ নেবে বলে ভাবেননি। একজন স্বজন বলেন, “একটা কথা-কাটাকাটি থেকে এমন মৃত্যু—এটা আমরা মেনে নিতে পারছি না। আমরা দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

স্থানীয় বাসিন্দারাও ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, পারিবারিক দ্বন্দ্ব মীমাংসার জন্য আলোচনার পথ খোলা থাকা উচিত ছিল। হঠাৎ করে সহিংসতার আশ্রয় নেওয়ায় একটি পরিবার আজ চিরতরে প্রিয়জনকে হারাল। এলাকাবাসীর কেউ কেউ বলেন, গ্রামাঞ্চলে ছোটখাটো বিরোধ অনেক সময় বড় আকার ধারণ করে, কিন্তু এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সামাজিক সচেতনতা জরুরি।

সামাজিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, পারিবারিক বিরোধ, জমি-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব বা ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে গ্রামবাংলায় সহিংসতার ঘটনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসব ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ মীমাংসার জন্য স্থানীয়ভাবে সালিশি বা মধ্যস্থতার কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই এমন মর্মান্তিক পরিণতি এড়ানো সম্ভব।

এই ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে পারিবারিক সহিংসতা ও আইনি সচেতনতার প্রশ্ন। আইনবিদরা বলছেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হলে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পারিবারিক বিরোধে দ্রুত আইনি বা সামাজিক সহায়তা নেওয়ার প্রবণতা বাড়াতে হবে।

বর্তমানে অভিযুক্ত আনিছুর রহমান পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। তাঁকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে। অন্যদিকে, নিহত খায়রুল হকের পরিবার ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় দিন গুনছে।

সব মিলিয়ে, কুড়িগ্রামের উলিপুরে এই ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং পারিবারিক বিরোধ থেকে জন্ম নেওয়া সহিংসতার ভয়াবহ পরিণতির একটি উদাহরণ। একটি মুহূর্তের রাগ ও অসংযম যে কত বড় ট্র্যাজেডি ডেকে আনতে পারে, খায়রুল হকের মৃত্যু সেই কঠিন বাস্তবতাই আবার স্মরণ করিয়ে দিল। সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা—সহিংসতার পথ নয়, সংলাপ ও আইনের পথই হতে হবে সমস্যার সমাধান।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত