প্রকাশ: ১৪ জুলাই’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দেশের শিক্ষাখাত-সংশ্লিষ্ট একটি আলোচিত প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার, বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান এম. কে. খায়রুল বাশার বাহারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা এই ব্যবসায়ীকে আজ সোমবার রাজধানী ঢাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম টিমের একটি বিশেষ ইউনিট আজ সকালে খায়রুল বাশারকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে একটি মানিলন্ডারিং মামলা তদন্তাধীন রয়েছে, যার ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সূত্র অনুযায়ী, খায়রুল বাশার বাহারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নতুন কিছু নয়। গত বছরের ১৭ অক্টোবরই তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রথম বড় পরিসরে অভিযোগ উঠে আসে, যখন অভিযোগ করা হয় যে, বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের নামে পরিচালিত কার্যক্রমের মাধ্যমে এক হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকারও বেশি আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্ক শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার নাম করে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে। তবে বাস্তবে এসব শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত সুযোগ না পেয়ে পড়াশোনায় এবং আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়েন। ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীরা পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করে এবং জবাবদিহিতা দাবি করেন।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাচারের অভিযোগও রয়েছে। এই অর্থ কোন কোন চ্যানেলে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং কারা এতে জড়িত—তা খুঁজে বের করতেই মূলত সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত চালিয়ে আসছিল।
সিআইডি জানায়, গ্রেপ্তারকৃত খায়রুল বাশারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করা হবে। এ ছাড়া, মামলার তদন্তে তার সহযোগীদের সম্পৃক্ততা যাচাই করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তদন্তে আরও বেশ কয়েকজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, এমনকি বিদেশে অবস্থিত কিছু অংশীদার প্রতিষ্ঠানের নামও উঠে এসেছে।
বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্ক ও ক্যামব্রিয়ান এডুকেশন গ্রুপ—এই দুটি প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অভিভাবকদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ বাড়তে থাকে যে, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না করে প্রতিষ্ঠানটি কৌশলে অর্থ সংগ্রহ করে যাচ্ছে, যা পরে বহু শিক্ষার্থীর জীবনে চরম হতাশা এবং আর্থিক ক্ষতি বয়ে এনেছে।
এই মামলার ফলাফল এবং তদন্তের অগ্রগতি দেশের বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, শিক্ষাবাণিজ্যের নামে প্রতারণার অভিযোগ শুধু খায়রুল বাশারের প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানকেও এ ধরনের অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, তারা এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেবে এবং দেশের শিক্ষাখাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাবে।
সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার, দ্রুত বিচার এবং অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই মামলার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে দেশের শিক্ষাখাতের প্রতি আস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
আপাতত, গ্রেপ্তারকৃত লায়ন খায়রুল বাশার বাহারকে আদালতে হাজির করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সিআইডি। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও পরবর্তী পদক্ষেপ জানতে আগামী কয়েকদিনের তদন্ত ফলাফলের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশ।