এনসিপির প্রার্থীতালিকায় শিক্ষায় তারুণ্যের ছাপ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫২ বার
এনসিপির প্রার্থীতালিকায় শিক্ষায় তারুণ্যের ছাপ

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জামায়াতে ইসলামীসহ ১০ দলের নির্বাচনী সমঝোতার অংশ হিসেবে দলটি ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তবে আসনের সংখ্যার চেয়েও বেশি নজর কেড়েছে এনসিপির প্রার্থীদের প্রোফাইল। শিক্ষা, বয়স ও পেশাগত বৈচিত্র্যের দিক থেকে এনসিপির এই প্রার্থী তালিকা বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক চর্চা থেকে কিছুটা ভিন্ন এক ছবি তুলে ধরেছে।

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এনসিপির ৩০ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৬ জনই উচ্চশিক্ষিত। এর মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রিধারী আছেন দুজন, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে ১৮ জনের। এ ছাড়া চারজন স্নাতক পাস এবং দুজন চিকিৎসক রয়েছেন। বাকি চার প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি বা সমমানের। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই চারজনের মধ্যেও একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক সম্মান তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। ফলে মোটের ওপর এনসিপির প্রার্থী তালিকায় শিক্ষার গড় মান তুলনামূলকভাবে উঁচু বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

পিএইচডি ডিগ্রিধারী দুই প্রার্থী হলেন কুড়িগ্রাম-২ আসনের আতিকুর রহমান মোজাহিদ এবং পিরোজপুর-৩ আসনের মো. শামীম হামিদী। তাঁরা দুজনই একাডেমিক ও গবেষণাভিত্তিক পটভূমি থেকে রাজনীতিতে এসেছেন। অন্যদিকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ১৮ জন প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাধিক পরিচিত মুখ। এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং দুই মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলম স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তাঁদের পাশাপাশি দলের দুই নারী প্রার্থী দিলশানা পারুল ও নাবিলা তাসনিদও এই তালিকায় রয়েছেন।

এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম স্নাতক ডিগ্রিধারী চার প্রার্থীর একজন। এ ছাড়া চিকিৎসা পেশা থেকে আসা দুজন প্রার্থীও রয়েছেন, যাঁদের একজন এমবিবিএস এবং অন্যজন ডেন্টাল সার্জন। এই বৈচিত্র্য এনসিপির প্রার্থী তালিকাকে আরও আলাদা করে তুলেছে।

বয়সের দিক থেকেও এনসিপির প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে তরুণ। হলফনামায় বয়স উল্লেখ থাকা ২৭ জন প্রার্থীর গড় বয়স মাত্র ৩৪ বছর। চল্লিশোর্ধ প্রার্থী রয়েছেন মাত্র চারজন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ নাটোর-৩ আসনের এস এম জার্জিস কাদির, যাঁর বয়স ৬৪ বছর। তিনি রাজশাহীর নিউ ডিগ্রি গভর্নমেন্ট কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এবং বর্তমানে এনসিপির নাটোর জেলা সদস্যসচিব। চল্লিশোর্ধ অন্য তিন প্রার্থী হলেন দিলশানা পারুল, সুলতান মুহাম্মদ জাকারিয়া মজুমদার ও মাজেদুল ইসলাম।

৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী প্রার্থী আছেন ১২ জন। এর বাইরে সবচেয়ে কম বয়সী প্রার্থীদের বয়স মাত্র ২৭ বছর। এই তালিকায় রয়েছেন নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলম। তাঁদেরসহ মোট ১০ জন প্রার্থীর বয়স ৩০-এর নিচে। দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেনের বয়সও মাত্র ২৮ বছর। ফলে এনসিপির প্রার্থী তালিকায় স্পষ্টভাবে তারুণ্যের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়।

নির্বাচনী সমঝোতার অংশ হিসেবে পাওয়া ৩০টি আসনের মধ্যে মৌলভীবাজার-৪ আসনটি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জন্যও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এই আসনে এনসিপির প্রার্থী প্রীতম দাশ। তিনি দলটির একমাত্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থী হওয়ায় তাঁর প্রার্থিতা আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।

পেশাগত দিক থেকেও এনসিপির প্রার্থীদের মধ্যে বৈচিত্র্য রয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রার্থী নিজেদের পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন ব্যবসা। মোট আটজন সরাসরি ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, আবার কেউ কেউ শিক্ষকতার পাশাপাশি ব্যবসার কথাও বলেছেন। পরামর্শক পেশায় আছেন চারজন প্রার্থী। তাঁদের মধ্যে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও রয়েছেন। সাংবাদিকতা পেশা থেকে আসা প্রার্থী রয়েছেন তিনজন, যাঁদের মধ্যে দুজন পূর্ণকালীন সাংবাদিক এবং একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতার সঙ্গে ব্যবসায় যুক্ত।

এ ছাড়া এনসিপির প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন উন্নয়নকর্মী, কৃষক, ব্যাংকার, আইনজীবী, শিক্ষক, গবেষক ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। এই পেশাগত বৈচিত্র্য দলটির রাজনৈতিক দর্শনে বহুমাত্রিকতার ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আয় ও সম্পদের হিসাবেও এনসিপির প্রার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। বার্ষিক আয়ে সবচেয়ে এগিয়ে নোয়াখালী-২ আসনের প্রার্থী সুলতান মুহাম্মদ জাকারিয়া মজুমদার। শিক্ষকতা ও গবেষণা পেশায় যুক্ত এই প্রার্থীর বার্ষিক আয় ৫০ লাখ টাকা। অন্যদিকে সবচেয়ে কম আয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের প্রার্থী আশরাফ উদ্দিন মাহদীর, যাঁর বার্ষিক আয় মাত্র ৩ লাখ ২৬ হাজার টাকার কিছু বেশি।

সম্পদের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা-২০ আসনের প্রার্থী নাবিলা তাসনিদ। তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর বাইরে তাঁর কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার রয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী মাজেদুল ইসলাম। অন্যদিকে সম্পদের দিক থেকে সবচেয়ে কম সম্পদশালী নরসিংদী-২ আসনের প্রার্থী সারোয়ার তুষার, যাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ মাত্র ৩ লাখ টাকা।

সামগ্রিকভাবে এনসিপির প্রার্থী তালিকা একদিকে যেমন উচ্চশিক্ষিত ও তরুণদের উপস্থিতি তুলে ধরছে, অন্যদিকে আয় ও সম্পদের বৈষম্য বাংলাদেশের সামগ্রিক সামাজিক বাস্তবতাকেও প্রতিফলিত করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রার্থী তালিকা ভোটারদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নির্ভর করবে প্রার্থীদের মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক বার্তার ওপর। তবে নিশ্চিতভাবেই এনসিপি শিক্ষিত ও তরুণ নেতৃত্বের একটি বিকল্প মডেল সামনে আনার চেষ্টা করছে, যা আসন্ন নির্বাচনের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত