প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে। নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্কে জড়িয়েছে বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে বিএনপি। দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ অভিযোগকে “হাইপার প্রোপাগান্ডার অংশ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
শনিবার সকালে এক প্রতিক্রিয়ায় রুহুল কবির রিজভী বলেন, তারেক রহমান নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন—এমন অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তার ভাষায়, নির্বাচন সামনে রেখে একটি মহল পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াতে এসব অভিযোগ উত্থাপন করছে। তিনি দাবি করেন, বিএনপি ও তার শীর্ষ নেতৃত্ব বরাবরই আইন ও বিধি মেনে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এই ধরনের অভিযোগ জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোর কৌশল ছাড়া কিছু নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে জাতীয় নাগরিক পার্টি তারেক রহমানের বিরুদ্ধে নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ তোলে। শুক্রবার সন্ধ্যায় নির্বাচনি পরিচালনা কমিটির বৈঠক শেষে দলের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই অভিযোগ প্রকাশ করা হয়। এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এ বিষয়ে বক্তব্য দেন।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, নির্বাচনি আচরণবিধি অনুযায়ী প্রচারণার সময় মাইক ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, রাত ৮টার পর মাইক ব্যবহার করে প্রচারণা চালানো নিষিদ্ধ হলেও তারেক রহমান মধ্যরাত পর্যন্ত মাইক ব্যবহার করে প্রচারণা চালিয়েছেন। এই ঘটনাকে তারা সরাসরি আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন বলে জানান তিনি।
প্রেস ব্রিফিংয়ে আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন যদি এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করে, তাহলে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তার অভিযোগ, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। তিনি দাবি করেন, এই অসম আচরণ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে এবং জনগণের আস্থা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এনসিপির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, দেশের গণমাধ্যমও একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে, যা একটি বড় ধরনের শঙ্কার বিষয়। তাদের মতে, নির্বাচনকালীন সময়ে গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি দলের পক্ষে অতিরিক্ত অবস্থান গ্রহণ করলে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এনসিপির এই অভিযোগের পরপরই বিএনপির পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে। রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তারেক রহমানকে ঘিরে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও সেই ধারাবাহিক অপপ্রচারেরই অংশ। তিনি বলেন, বাস্তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন জায়গায় বাধা, হয়রানি ও হামলার মুখে পড়ছেন, অথচ সেসব বিষয়ে প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ রয়ে গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে এমন অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ নতুন কিছু নয়। তবে এসব অভিযোগ যদি প্রমাণভিত্তিকভাবে নিষ্পত্তি না হয়, তাহলে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ও সক্রিয় ভূমিকা এই পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ যেই দলের বিরুদ্ধেই আসুক না কেন, সেগুলো যাচাই করে স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে বিতর্ক অনেকটাই প্রশমিত হতে পারে।
নির্বাচনি আচরণবিধি সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। বিশেষজ্ঞদের মতে, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। তাই এসব অভিযোগ যাচাইয়ে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছতা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত অভিযোগ তোলার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ করা এবং প্রমাণভিত্তিক বক্তব্য উপস্থাপন করা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করলেও এনসিপি তাদের দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই আচরণবিধি লঙ্ঘন, প্রশাসনের ভূমিকা এবং গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশা, এসব বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করবে। রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে জনগণ যেন বিভ্রান্ত না হয় এবং ভোটাধিকার প্রয়োগে কোনো বাধার মুখে না পড়ে—এটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।