প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক শিল্পের রাজধানী গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। দেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সংকট, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে তিনি এই অঞ্চলের জন্য একটি সমন্বিত উন্নয়ন ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। পঞ্চগড়, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও রংপুরে ধারাবাহিক নির্বাচনি জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি উত্তরবঙ্গের মানুষের আশা, ক্ষোভ এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
পঞ্চগড়ের চিনিকল মাঠে আয়োজিত জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, উত্তরবঙ্গকে পরিকল্পিতভাবে পিছিয়ে রাখা হয়েছে এবং এই অঞ্চলের মানুষ যুগের পর যুগ বৈষম্যের শিকার। তিনি দাবি করেন, ক্ষমতার পালাবদল হলেও উত্তরবঙ্গের ভাগ্য বদলায়নি। তার ভাষায়, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত দেশের কথা বলা হলেও বাস্তবে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমান উন্নয়ন হয়নি। তিনি বলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বলছি, সুযোগ পেলে পাঁচ বছরেই উত্তরবঙ্গের চেহারা বদলে দেওয়া সম্ভব।
ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা। তিনি বলেন, দিনাজপুর, রংপুর ও আশপাশের জেলা দেশের খাদ্য উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখে, অথচ কৃষক ন্যায্যমূল্য পায় না। আলু, ধান, ভুট্টা, আখ, লিচুসহ বিভিন্ন ফসল সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলার কথা বলেন তিনি। বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে ফেরানোর অঙ্গীকারও করেন জামায়াত আমির। তার মতে, কৃষিকে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত না করলে উত্তরবঙ্গের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
নদী ও পানিসম্পদ নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি। তিস্তা, করতোয়া, ধরলাসহ উত্তরাঞ্চলের নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় কৃষি ও জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব পড়েছে উল্লেখ করে তিনি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। রংপুরের জনসভায় তিনি বলেন, নদী জীবন ফিরে পেলে উত্তরবঙ্গও জীবন ফিরে পাবে। কে খুশি হলো আর কে হলো না, তা বিবেচ্য নয়, দায়িত্ব পেলে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় প্রথম কোদাল এখানেই বসবে।
ডা. শফিকুর রহমান স্বাস্থ্যখাতকে উত্তরবঙ্গ উন্নয়নের আরেকটি বড় স্তম্ভ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি প্রতিটি জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন এবং বঞ্চিত অঞ্চলগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন। পঞ্চগড়েও একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলার ঘোষণা দেন তিনি। তার বক্তব্যে বিনা মূল্যে চিকিৎসা সুবিধা দেওয়ার কথাও উঠে আসে, বিশেষ করে ছয় বছরের নিচে শিশু ও ষাট বছরের বেশি বয়সীদের জন্য।
তার বক্তব্যে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেন, দেশ থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। সেই অর্থ ফিরিয়ে এনে দেশের মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার অঙ্গীকার করেন তিনি। তার ভাষায়, দুর্নীতি করব না এবং কাউকে করতেও দেব না। চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাস বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, জনগণের অর্থে যেন কেউ বেগমপাড়া তৈরি করতে না পারে, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দিনাজপুরের জনসভায় তিনি আরও বলেন, উত্তরবঙ্গের তরুণদের বেকার ভাতা দিয়ে অলস করে রাখা নয়, বরং কাজ দিয়ে সম্মানিত করা হবে। টেকনিক্যাল প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার কথা বলেন তিনি। নারীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, ধর্ম বা পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতেই সবাই সুযোগ পাবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের সমাবেশে সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার ঘোষণা দেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গের উৎপাদিত পণ্য সারা দেশে ও বিদেশে পৌঁছাতে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। একইসঙ্গে তিনি জানান, দেশের ৬৪ জেলায় উন্নতমানের একটি করে হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে এবং বঞ্চিত এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বক্তব্যে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর সমালোচনাও করেন। তিনি বলেন, কিছু দল নির্বাচন এলেই সক্রিয় হয়, কিন্তু জামায়াতে ইসলামী দুঃসময়ে জনগণের পাশে থেকেছে। শত নির্যাতনের মধ্যেও দলটি দেশ ছেড়ে যায়নি বলে দাবি করেন তিনি। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
জামায়াতের এই জনসভাগুলো ঘিরে উত্তরবঙ্গজুড়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। পঞ্চগড়ের চিনিকল মাঠে জনস্রোত ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকা ও মহাসড়কে। বিভিন্ন উপজেলা থেকে মিছিলসহকারে নেতাকর্মী ও সমর্থকরা সমাবেশে অংশ নেন। দলীয় নেতাদের মতে, এই জনসমাগম উত্তরবঙ্গে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন নিয়ে ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য নির্বাচনি রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কৃষিভিত্তিক শিল্প, নদী ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে তার পরিকল্পনা উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করেন তারা।
সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক শিল্পের রাজধানী বানানোর ঘোষণা শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের আশা ও প্রত্যাশাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। এই প্রত্যয় বাস্তবে কতটা রূপ পায়, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নীতি বাস্তবায়ন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর।