প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নিউজিল্যান্ডের উত্তর দ্বীপে ভয়াবহ এক ভূমিধসের ঘটনায় পুরো দেশজুড়ে নেমে এসেছে শোক আর উৎকণ্ঠা। দেশটির পুলিশ জানিয়েছে, ভূমিধসে নিখোঁজ হওয়া ছয়জনের কেউই বেঁচে আছেন—এমন আশা এখন প্রায় নেই বললেই চলে। টানা ভারি বৃষ্টিতে সৃষ্ট এই দুর্যোগ শুধু একটি পর্যটন এলাকায় প্রাণঘাতী বিপর্যয়ই ডেকে আনেনি, বরং আবারও জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় নিউজিল্যান্ডের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি স্থানীয় সময়, উত্তর দ্বীপের পূর্ব উপকূলের জনপ্রিয় পর্যটন শহর তৌরাঙ্গার কাছাকাছি মাউন্ট মাউঙ্গানুই এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। গ্রীষ্মকালীন ছুটির কারণে যখন ক্যাম্পগ্রাউন্ডে পর্যটকদের ভিড় ছিল, ঠিক তখনই টানা ভারি বৃষ্টির ফলে পাহাড়ি ঢাল থেকে হঠাৎ করে নেমে আসে বিপুল পরিমাণ মাটি ও ধ্বংসস্তূপ। মুহূর্তের মধ্যে তা চাপা দেয় ক্যাম্পগ্রাউন্ডের একটি বড় অংশ।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় দুই কিশোরসহ মোট ছয়জন নিখোঁজ হন। নিখোঁজদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী একজনের বয়স মাত্র ১৫ বছর, যা ঘটনাটিকে আরও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে। শুরুতে উদ্ধারকারীরা আশা করেছিলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ হয়তো জীবিত থাকতে পারেন। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, সেই আশা ততই ফিকে হয়ে এসেছে।
নিউজিল্যান্ড পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বৃহস্পতিবারের পর থেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে আর কোনো জীবিত মানুষের উপস্থিতির চিহ্ন পাওয়া যায়নি। উদ্ধার অভিযানের একপর্যায়ে দেহাবশেষ উদ্ধার হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ভারি মাটি ও ভেজা ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকর্মীদের জন্য কাজ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আপাতত উদ্ধার অভিযান বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলে আবার অভিযান শুরু করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ঘটনাস্থলে কাজ করা উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, মাটির স্তর এতটাই অস্থিতিশীল যে যেকোনো সময় নতুন করে ভূমিধস নামতে পারে। ভারি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করাও কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ এতে মাটির ভারসাম্য আরও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে উদ্ধার কাজ এগিয়ে নিতে হচ্ছে অত্যন্ত ধীরে এবং সতর্কতার সঙ্গে।
এদিকে, নিউজিল্যান্ডের অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি পরিষেবা বিভাগ সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনেও ওই এলাকায় ভারি বৃষ্টি হতে পারে। এতে নতুন করে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়বে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, উত্তর দ্বীপের পূর্ব উপকূলজুড়ে মাটি ইতিমধ্যেই পানিতে সম্পৃক্ত হয়ে আছে। এমন অবস্থায় সামান্য বৃষ্টিতেও বড় ধরনের ধস নামতে পারে।
এই ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লুক্সন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, “এই হৃদয়বিদারক খবর গোটা দেশকে মর্মাহত করেছে। নিখোঁজদের পরিবার ও প্রিয়জনদের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা।” শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি তিনি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের সান্ত্বনা দেন এবং সরকার সব ধরনের সহায়তা দেবে বলে আশ্বাস দেন।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, এই দুর্যোগ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। উদ্ধার অভিযান, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মাউন্ট মাউঙ্গানুই এলাকা সাধারণত নিরাপদ হিসেবেই পরিচিত ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টানা বৃষ্টি ও আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে পাহাড়ি ঢালগুলো ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। অনেকেই বলছেন, আগাম সতর্কতা থাকলে হয়তো এই দুর্ঘটনার মাত্রা কিছুটা কমানো যেত।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চলতি সপ্তাহেই একই অঞ্চলের কাছাকাছি পাপামোয়া এলাকায় আরেকটি ভূমিধসে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মাউন্ট মাউঙ্গানুইয়ের এই দুর্ঘটনা নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি স্পষ্ট সতর্ক সংকেত যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিউজিল্যান্ডের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ ও পাহাড়ি দেশগুলোতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
পরিবেশ ও ভূতত্ত্ববিদদের মতে, টানা ভারি বৃষ্টির ফলে মাটির ভেতরের বন্ধন দুর্বল হয়ে যায়। পাহাড়ি এলাকায় গাছপালার সংখ্যা কমে গেলে বা ভূমির স্বাভাবিক গঠন বদলে গেলে ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। নিউজিল্যান্ডে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্যোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই দুর্ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে পর্যটন এলাকাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে। গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে হাজারো মানুষ ক্যাম্পগ্রাউন্ড ও পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণে যান। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সেখানে পর্যাপ্ত সতর্কতা ও আগাম ব্যবস্থা আছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নিখোঁজদের পরিবারগুলো এখন চরম অনিশ্চয়তা ও বেদনার মধ্য দিয়ে সময় কাটাচ্ছে। প্রিয়জনের ফিরে আসার ক্ষীণ আশাটুকু আঁকড়ে ধরে তারা অপেক্ষা করছেন উদ্ধার অভিযানের পরবর্তী খবরে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, পরিবারগুলোর জন্য মানসিক সহায়তা ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে ভূমিধস নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব ঘটনার ঘনত্ব ও তীব্রতা যে হারে বাড়ছে, তা উদ্বেগজনক। মাউন্ট মাউঙ্গানুইয়ের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শুধু কয়েকটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির জন্যই এক কঠিন শিক্ষা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সহাবস্থান করতে হলে প্রস্তুতি, সচেতনতা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনার বিকল্প নেই—এই বার্তাই যেন আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
দেশজুড়ে এখন একটাই প্রার্থনা—যেন নিখোঁজদের পরিবারগুলো এই শোক সামলানোর শক্তি পায় এবং ভবিষ্যতে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দ্রুত গ্রহণ করা হয়।