প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
অবশেষে গুঞ্জনই সত্যি হলো। আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলছে না বাংলাদেশ। তাদের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল। ক্রিকেটভিত্তিক বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যম ক্রিকবাজ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বদলি হিসেবে খেলবে স্কটিশরা। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে বিশ্ব ক্রিকেট অঙ্গনে তৈরি হয়েছে তীব্র আলোচনা, ক্ষোভ ও রাজনৈতিক সমীকরণের নতুন অধ্যায়।
বাংলাদেশের বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ার পেছনের ঘটনাপ্রবাহ কেবল ক্রিকেটীয় নয়, বরং কূটনীতি, নিরাপত্তা এবং ক্ষমতার রাজনীতির জটিল সমীকরণে আবদ্ধ। দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে ভারতের মাটিতে খেলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে আসছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। বিসিবির অবস্থান ছিল একেবারে স্পষ্ট। ভারতে গিয়ে ম্যাচ খেলার বিষয়ে কোনো আপস নয়। শত চাপ, নানা প্রস্তাব এবং পরোক্ষ হুমকির মুখেও সেই অবস্থান থেকে সরে আসেনি বোর্ড।
বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বোর্ড আইসিসিকে জানিয়ে দেয়, যদি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সব ম্যাচ সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কার মাটিতে আয়োজন করা হয়, তাহলেই অংশ নেবে বাংলাদেশ। অন্যথায় ভারতীয় ভেন্যুতে খেলতে যাবে না দল। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল সরকারের স্পষ্ট অবস্থান। যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল একাধিকবার প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার বিষয়ে সরকার কোনো সবুজ সংকেত দেয়নি।
গত ৪ জানুয়ারি বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসিকে তাদের সিদ্ধান্ত জানায়। শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, বাংলাদেশের অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে আইসিসি হয়তো শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ আয়োজনের পথ খুঁজবে। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই আশার আলো ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসে। আইসিসি একপর্যায়ে বাংলাদেশকে কার্যত আল্টিমেটাম দেয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করলে বিকল্প দল অন্তর্ভুক্ত করা হবে, এমন বার্তাই দেওয়া হয়।
শেষ পর্যন্ত বিসিবি সেই আল্টিমেটামও দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সম্মতি না দেওয়ায় আইসিসি আনুষ্ঠানিকভাবে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই স্পষ্ট হয়ে যায়, বাংলাদেশের জন্য এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে।
এই পরিবর্তনের ফলে প্রতিযোগিতার প্রাথমিক পর্বে গ্রুপ ‘সি’-তে জায়গা পাচ্ছে স্কটল্যান্ড। সূচি অনুযায়ী তারা কলকাতায় ৭ ফেব্রুয়ারি ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ৯ ফেব্রুয়ারি ইতালি এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামবে। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে নেপালের মুখোমুখি হবে স্কটিশরা। যে গ্রুপে বাংলাদেশ খেলার কথা ছিল, সেখানে স্কটল্যান্ডের অন্তর্ভুক্তি বিশ্বকাপের চিত্রই বদলে দিল।
বাংলাদেশের অনুপস্থিতি কেবল একটি দলের না খেলা নয়, বরং কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর হতাশা। গত এক দশকে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে বাংলাদেশ যে অগ্রগতি দেখিয়েছে, তা বিশ্বকাপের মঞ্চে আরও একবার প্রমাণ করার অপেক্ষায় ছিল সমর্থকরা। কিন্তু নিরাপত্তা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তের প্রশ্নে সেই প্রত্যাশা আপাতত থমকে গেল।
বিশ্বকাপের ‘সি’ গ্রুপে বাংলাদেশের সঙ্গী হিসেবে থাকা ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজও শ্রীলঙ্কায় ভ্রমণে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। তাদের অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের জন্য বিকল্প ভেন্যুর পথ আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে আইসিসির ভেতরে গ্রুপ পুনর্বিন্যাসের আলোচনা শুরু হয়। আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে গ্রুপ অদল-বদলের সম্ভাবনাও সামনে আসে। কিন্তু ক্রিকেট আয়ারল্যান্ড সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি।
এখানেই শুরু হয় বিতর্কের নতুন অধ্যায়। জানা গেছে, আয়ারল্যান্ড যাতে বাংলাদেশের সঙ্গে গ্রুপ পরিবর্তনে সম্মত না হয়, সে জন্য ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে লোভনীয় আর্থিক প্রস্তাব দেওয়া হয়। ভবিষ্যৎ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে আয়ারল্যান্ডকে নিজেদের পক্ষে রাখে বিসিসিআই। যদিও এসব অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয়নি, তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলে বিষয়টি নিয়ে গুঞ্জন ও সমালোচনা থামেনি।
আইসিসির বোর্ড সভার আগে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেয়। পিসিবি আইসিসিকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা শঙ্কার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানায়। তারা প্রস্তাব দেয়, বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কা কিংবা পাকিস্তানের মাটিতে আয়োজন করা হোক। এই প্রস্তাব ক্রিকেট কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করলেও আইসিসি শেষ পর্যন্ত তা আমলে নেয়নি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইসিসির এই সিদ্ধান্তে ভারতের প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্ব ক্রিকেটের অর্থনীতি, সম্প্রচার স্বত্ব এবং আয় কাঠামোর বড় অংশ ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে ভারতের অবস্থান কার্যত নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটিরই বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেল।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে, দেশের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ক্রিকেট খেলতে গিয়ে যদি নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকে, তাহলে কোনো টুর্নামেন্টেই অংশ নেওয়া সম্ভব নয়। বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত হয়তো স্বল্পমেয়াদে হতাশাজনক, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি নীতিগত অবস্থানের উদাহরণ হয়ে থাকবে।
সমর্থকদের প্রতিক্রিয়াও বিভক্ত। কেউ কেউ মনে করছেন, বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে না খেলা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বড় ক্ষতি। আবার অনেকে বলছেন, নিরাপত্তা ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে আপস না করাই সঠিক সিদ্ধান্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তর্ক-বিতর্ক, আবেগ আর ক্ষোভের প্রকাশ।
স্কটল্যান্ডের জন্য এই সুযোগ অবশ্য ঐতিহাসিক। সহযোগী দেশ হিসেবে তারা দীর্ঘদিন ধরেই বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণের অপেক্ষায় ছিল। বাংলাদেশের জায়গায় বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাওয়া তাদের ক্রিকেটের জন্য বড় প্রাপ্তি। তবে এই সুযোগের পেছনে যে বিতর্ক আর কূটচালের গল্প জড়িয়ে আছে, তা বিশ্ব ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ শাসন কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
সব মিলিয়ে, আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না খেলা কেবল একটি ক্রীড়া সংবাদ নয়। এটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রাজনীতির এক নগ্ন বাস্তবতা। যেখানে নিরাপত্তা, কূটনীতি, অর্থনীতি আর ক্ষমতার হিসাব মিলেমিশে যায়। এবারের বিশ্বকাপ মাঠে নামবে স্কটল্যান্ড, কিন্তু বাংলাদেশের অনুপস্থিতি বারবার মনে করিয়ে দেবে, ক্রিকেট শুধু খেলার মাঠে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বৈশ্বিক রাজনীতিরও অংশ।