প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আবুধাবিতে দুই দিনের শান্তি আলোচনার পর ইউক্রেন ও রাশিয়া আগামী সপ্তাহে দ্বিতীয় দফায় সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এই বৈঠক আগামী ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। মধ্যপ্রাচ্যের এই বৈঠকে দুই দেশের প্রতিনিধি প্রথমবার সরাসরি বসেছেন, যা প্রায় চার বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈঠকের সময় ইউক্রেনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, রাশিয়ার একের পর এক প্রাণঘাতী হামলার কারণে আলোচনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষত বৈঠকের দ্বিতীয় দিনে রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটির বড় শহরগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সাধারণ মানুষ আতঙ্কে আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হন। কিয়েভ কর্তৃপক্ষ এটিকে ‘রুশ সন্ত্রাসের রাত’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, “সব পক্ষকে এক টেবিলে বসানোই একটি বড় পদক্ষেপ ছিল। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নির্ধারণে অনেক অগ্রগতি হয়েছে।” এ কর্মকর্তা আরও বলেন, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংলাপ ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বৈঠক প্রসঙ্গে বলেছেন, “অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনাটি অত্যন্ত গঠনমূলক ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা আশা করি, আগামী দ্বিতীয় দফায় আরও কার্যকর সমাধানের পথে অগ্রগতি হবে।”
এর আগে গত গ্রীষ্মে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে দুই দেশের আলোচকরা মুখোমুখি বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবে সেই বৈঠক মূলত বন্দিবিনিময় চুক্তি ও সীমিত কিছু নিরাপত্তা বিষয়েই সীমাবদ্ধ ছিল। এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার আলোচনায় সরাসরি দুই দেশের অংশগ্রহণ, যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী সমাধানের জন্য নতুন এক পথ খুলে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদিও এই আলোচনা এখনও চূড়ান্ত সমাধান নয়, তবু এটি দুই দেশের মধ্যে আস্থা পুনঃস্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হিসেবে ধরা হচ্ছে। ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ সংকট এবং রাশিয়ার সামরিক চাপের মধ্যে এই সংলাপ চালিয়ে যাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে সাধারণ কিয়েভবাসীর মধ্যে এখনও দ্রুত কোনো স্থায়ী সমাধান নিয়ে আশাবাদ সৃষ্টি হয়নি। প্রায় চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিদিনের জীবনযাত্রা অতিমাত্রায় জটিল এবং শীতকালে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হওয়া সাধারণ মানুষকে ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখছে।
সংগঠিত তথ্য অনুযায়ী, আবুধাবিতে বৈঠকে দুই দেশের প্রতিনিধিদল বৈঠকের প্রথম দিন মানবিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি, যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়া এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। আলোচনার সময় বিশেষ করে নাগরিকদের নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ, খাদ্য সংকট নিরসন, এবং ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে পুনর্বাসন কার্যক্রমের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই শান্তি আলোচনার মাধ্যমে শুধুমাত্র যুদ্ধবিরতি নয়, দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পথও তৈরি হতে পারে। তবে রাশিয়ার সামরিক কার্যক্রম ও একপক্ষীয় পদক্ষেপ আলোচনার প্রভাবকে দুর্বল করার সম্ভাবনা রাখে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ইউক্রেনের দাবিগুলোর মধ্যে মূলত রাশিয়ার হামলা বন্ধ, সীমান্তে সেনা প্রত্যাহার, বন্দি মুক্তি, এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা অন্যতম। অপরদিকে রাশিয়া ইউক্রেনের নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিষয়গুলোতে নিজের শর্ত মেনে নেওয়াতে আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এই দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে একটি পরিপূর্ণ সমঝোতা তৈরি করা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে।
এই বৈঠককে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বলছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে আস্থা তৈরি ও সহমত গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে হামলা ও সামরিক উত্তেজনা থাকায় প্রক্রিয়াটি জটিল। তাই আগামী ১ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় দফা বৈঠক আন্তর্জাতিক নজরদারির সঙ্গে নজরে রাখা হবে।
বিশ্লেষকরা আশা করছেন, দ্বিতীয় দফার আলোচনায় যদি উভয় পক্ষ প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে, তবে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এটি কেবল ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হবে।