আ. লীগ যা করেছে, আমরা তা করব না: ফখরুল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৮৩ বার

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনি জনসভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, আওয়ামী লীগ যে রাজনীতি করেছে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে সেই পথ অনুসরণ করবে না। তিনি বলেন, ক্ষমতা মানুষের সেবা করার জন্য, দমন-পীড়ন আর দুর্বৃত্তায়নের জন্য নয়। দলের ভেতরে কেউ যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে বা ‘আওয়ামী স্টাইলে’ দুর্বৃত্তায়নে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

রোববার ২৫ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বরুনাগাঁও ও চেরাডাঙ্গী এলাকায় গণসংযোগের তৃতীয় দিনে তিনি এসব কথা বলেন। নির্বাচনি প্রচারণার অংশ হিসেবে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন বিএনপির মহাসচিব। বক্তব্যে তিনি নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ত্যাগ, সংগ্রাম এবং ব্যক্তিগত ক্ষতির কথা তুলে ধরেন। তার ভাষায়, রাজনীতি করতে গিয়ে তাকে পৈতৃক ভিটেমাটি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে, কিন্তু কখনো আদর্শের সঙ্গে আপস করেননি।

মির্জা ফখরুল বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বারবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গত ১৫ বছরে তার বিরুদ্ধে ১১১টি মামলা দেওয়া হয়েছে, ১১ বার কারাগারে যেতে হয়েছে। কারাবন্দি থাকা অবস্থায় তার স্ত্রীর অস্ত্রোপচার হলেও তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। তবুও তিনি মাথা নত করেননি, আদর্শ থেকে সরে আসেননি। তার দাবি, এই ত্যাগ শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্নের জন্য।

দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দিয়ে বিএনপির মহাসচিব বলেন, পরিষ্কারভাবে বলে দিতে চান, দলের কেউ অপরাধ করলে তা গোপন করার সুযোগ নেই। কেউ যদি চাঁদাবাজি, দখলদারি বা সহিংসতার সঙ্গে জড়ায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আওয়ামী লীগ যে পাপ করেছে, বিএনপির গায়ে সেই কলঙ্ক লাগতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, বিএনপি প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না, বরং ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়।

বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিয়েও সরব হন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, নির্বাচনি মাঠে জামায়াতের প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ দেখে ভোটারদের সতর্ক থাকতে হবে। তার ভাষায়, একাত্তরে এই প্রতীক জাতি দেখেছে। সেই সময় তারা পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করেছিল। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না, সময়ের ব্যবধান হলেও সত্য চাপা পড়ে না। তিনি বলেন, এই অঞ্চলে জামায়াতের গভীর শিকড় নেই, তাই ভোট দেওয়ার আগে মানুষকে ইতিহাস স্মরণ রাখতে হবে।

ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু বর্তমানের কথা নয়, অতীতের সত্যও মনে রাখতে হবে। গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট দেওয়া নয়, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বও নাগরিকদের। ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল পুরো জাতিকে দিতে হয়— এমন সতর্কবার্তাও দেন তিনি।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উদ্দেশে আলাদা করে বক্তব্য রাখেন বিএনপির মহাসচিব। হিন্দু ভোটারদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, হিন্দু ভাই-বোনেরা যেন কোনো ভয় না পান। আপনারা এই দেশের সমান নাগরিক। যাকে ইচ্ছা তাকে ভোট দেওয়ার অধিকার আপনাদের আছে। গণতান্ত্রিক দেশে ভয় দেখিয়ে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি হিন্দু সম্প্রদায়কে শক্ত হওয়ার, ঐক্য গড়ে তোলার এবং নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান।

জুলাই আন্দোলনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, এখন দেশে এক ধরনের মুক্ত বাতাস বইছে। দীর্ঘ সময় পর মানুষ কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে। তার মতে, এখন আর হানাহানি, প্রতিহিংসা বা মামলাবাজির রাজনীতি করার সময় নয়। আওয়ামী লীগ মামলা দিয়ে, নিপীড়ন চালিয়ে রাজনীতি করেছে বলে বিএনপিকেও সেই পথ অনুসরণ করতে হবে— এমন চিন্তা দলটি করে না।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমাদের ওপর যে নির্যাতন চালিয়েছে, আমরা ক্ষমতায় গেলে সেটির পুনরাবৃত্তি করব না। এটি কোনো আপসের রাজনীতি নয়, বরং একটি নতুন ভ্রাতৃত্ববোধের সমাজ গড়ার সংগ্রাম। যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু দমন-পীড়ন থাকবে না। যেখানে সরকার সমালোচনা সহ্য করবে এবং বিরোধী কণ্ঠ দমিয়ে রাখা হবে না।

স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কথা বলার সময় মির্জা ফখরুল উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা-ঘাট বা ভবন নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হয়, যখন মানুষের অধিকার নিশ্চিত হয়, ন্যায়বিচার পাওয়া যায় এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে সেই পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয়।

তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এবারের নির্বাচনে বিএনপি নিজেদের শুধু একটি ক্ষমতাপ্রত্যাশী দল হিসেবে নয়, বরং একটি বিকল্প রাজনৈতিক দর্শনের বাহক হিসেবে তুলে ধরতে চায়। যে দর্শনে প্রতিহিংসা নয়, বরং সহনশীলতা থাকবে। দমন নয়, থাকবে আইনের শাসন। ভয় নয়, থাকবে স্বাধীনতা।

ঠাকুরগাঁওয়ের গণসংযোগে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষদের অনেকে বলেন, দীর্ঘদিন পর এমন বক্তব্য শুনছেন, যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি জোরালোভাবে দেওয়া হচ্ছে। তারা আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচনের পর যেই সরকারই আসুক, এই ধরনের প্রতিশ্রুতি যেন বাস্তব রূপ পায়।

সব মিলিয়ে, ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাচনি জনসভায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান ও আশু নির্বাচনি বার্তাকে স্পষ্ট করেছে। আওয়ামী লীগের শাসনামলের দমন-পীড়নের বিপরীতে একটি ভিন্ন, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেন। এখন দেখার বিষয়, ভোটাররা সেই বার্তাকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে তাদের রায় দেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত