ভারত থেকে এল ১২৫ মেট্রিক টন বিস্ফোরক, বিশেষ সতর্কতা জারি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৪ বার

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক আমদানি করা হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যায় ভারতের আটটি ট্রাকে করে আনা মোট ১২৫ মেট্রিক টন বিস্ফোরক দ্রব্য বেনাপোল বন্দরের ৩১ নম্বর ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ডে প্রবেশ করে। বিপজ্জনক শ্রেণিভুক্ত এই চালান বন্দরে পৌঁছানোর পর থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে এবং নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

বন্দর সূত্র জানায়, আমদানিকৃত বিস্ফোরকগুলো বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং প্রকল্পের খনন ও উৎপাদন কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য আনা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড এই বিস্ফোরকের আমদানিকারক, আর ভারতের সুপার শিভ শক্তি কেমিক্যাল প্রাইভেট লিমিটেড রপ্তানিকারক হিসেবে চালানটি পাঠিয়েছে। শিল্পকারখানা ও খনিজ উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত হলেও এত বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক একসঙ্গে আমদানি হওয়ায় বিষয়টি স্থানীয়ভাবে বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে।

বেনাপোল বন্দর দেশের অন্যতম ব্যস্ত স্থলবন্দর। প্রতিদিন হাজারো মানুষ, পণ্যবাহী ট্রাক ও শ্রমিকের চলাচল এখানে স্বাভাবিক চিত্র। এমন জনবহুল এলাকায় বিপজ্জনক দ্রব্য সংরক্ষণ ও স্থানান্তরকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বন্দরসংশ্লিষ্ট শ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তা মোকাবিলায় কী ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।

তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিস্ফোরক চালানটি বন্দরে প্রবেশের পর থেকেই সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন জানান, চালানটি আসার আগেই কাস্টমস, বন্দর নিরাপত্তা বিভাগ, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ফায়ার সার্ভিসকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। বিস্ফোরক বহনকারী ট্রাক বন্দরে ঢোকার পর থেকেই সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে নজরদারি করছে।

শামীম হোসেন বলেন, বিপজ্জনক পণ্যের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেওয়া হয় না। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড ও দেশের প্রচলিত আইন অনুসরণ করেই বিস্ফোরক সংরক্ষণ ও হ্যান্ডলিং করা হচ্ছে। ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ডে আলাদা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে, যেখানে অপ্রয়োজনীয় প্রবেশ সীমিত রাখা হয়েছে। সার্বক্ষণিক পাহারা ও নজরদারির পাশাপাশি অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরকগুলো দীর্ঘ সময় বন্দরে রেখে দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। প্রয়োজনীয় কাস্টমস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এগুলো নির্ধারিত গন্তব্যে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এতে বন্দরে ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য সংরক্ষণের সময় কমে আসবে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিস্ফোরক আমদানির ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত কঠোর নিয়ম রয়েছে। আমদানির আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নিরাপত্তা সংস্থার অনুমোদন নিতে হয়। পরিবহন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট নির্দেশনা মানতে হয়। এই চালানটির ক্ষেত্রেও সব ধরনের অনুমোদন ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং প্রকল্প দেশের খনিজ খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া এলাকায় অবস্থিত এই প্রকল্পে ভূগর্ভস্থ খননের মাধ্যমে গ্রানাইট উত্তোলন করা হয়। শক্ত পাথর ভাঙার জন্য নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের প্রয়োজন হয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি। সেই প্রয়োজন মেটাতেই নিয়মিতভাবে বিস্ফোরক আমদানি করা হয়। তবে একসঙ্গে ১২৫ মেট্রিক টন বিস্ফোরক আসায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বিস্ফোরক মানেই ঝুঁকি— তবে ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করে ব্যবস্থাপনার ওপর। সঠিকভাবে সংরক্ষণ, পরিবহন ও ব্যবহার করা হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা অনেকটাই কমে যায়। তারা মনে করেন, বন্দর এলাকায় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সমন্বিত উপস্থিতি ইতিবাচক দিক। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বজায় রাখাও জরুরি, যাতে গুজব বা অযথা আতঙ্ক ছড়িয়ে না পড়ে।

স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, বেনাপোল বন্দর দিয়ে আগেও বিস্ফোরক এসেছে, তবে পরিমাণ তুলনামূলক কম ছিল। এবার পরিমাণ বেশি হওয়ায় মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল ও দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। তারা আশা প্রকাশ করেন, কর্তৃপক্ষ যেহেতু বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে, তাই নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি থাকবে না।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, বিস্ফোরক বহনকারী ট্রাকগুলো যখন বন্দর থেকে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে, তখনও বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্দিষ্ট রুট ব্যবহার, গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় এসকর্টের মাধ্যমে পরিবহন সম্পন্ন করা হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় নজরদারি থাকবে গোয়েন্দা সংস্থারও।

সব মিলিয়ে, বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ১২৫ মেট্রিক টন বিস্ফোরক আমদানি একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু স্পর্শকাতর ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একদিকে এটি দেশের খনিজ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজন মেটাতে সহায়ক, অন্যদিকে জনবহুল এলাকায় বিপজ্জনক দ্রব্যের উপস্থিতি বাড়তি দায়িত্ব আর সতর্কতার দাবি রাখে। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দেওয়া আশ্বাস অনুযায়ী, যদি সব নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে মানা হয় এবং দ্রুত গন্তব্যে পাঠানো সম্ভব হয়, তবে বড় ধরনের ঝুঁকি এড়ানো যাবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত