হিমশীতল দাপটে স্থবির যুক্তরাষ্ট্র, অন্ধকারে ১০ লাখ মানুষ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২৩ বার
হিমশীতল দাপটে স্থবির যুক্তরাষ্ট্র, অন্ধকারে ১০ লাখ মানুষ

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নজিরবিহীন শীতকালীন ঝড় জনজীবনকে কার্যত থমকে দিয়েছে। টেক্সাস থেকে নিউ ইংল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় তীব্র তুষারপাত, হিমবৃষ্টি ও বরফাচ্ছাদিত ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে বিপর্যস্ত হয়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত সাতজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন প্রায় ১০ লাখ মানুষ। একদিনেই বাতিল করা হয়েছে ১৬ হাজারের বেশি ফ্লাইট, স্থবির হয়ে পড়েছে আকাশ ও স্থল যোগাযোগ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা এটিকে ‘জীবননাশের ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে আখ্যায়িত করেছে এবং সতর্ক করেছে—এই অবস্থা আরও কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে।

দেশটির দক্ষিণাঞ্চল থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল—সবখানেই শীতের তীব্রতা অস্বাভাবিক। লুইজিয়ানায় অন্তত দুইজনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। টেক্সাসে আরও একজনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, বরফ জমে গাছের ডাল ভেঙে পড়ায় বিদ্যুৎ লাইনে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের আঘাতে টেনেসি অঙ্গরাজ্যে তিন লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন। মিসিসিপিতে বিদ্যুৎ নেই এক লাখ ৬০ হাজারের বেশি গ্রাহকের ঘরে। লুইজিয়ানা ও টেক্সাসেও হাজার হাজার পরিবার অন্ধকারে রাত কাটাচ্ছে। মধ্য-আটলান্টিক অঞ্চল থেকেও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবর মিলছে।

দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্য মিসিসিপির অক্সফোর্ড শহর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সেখানে প্রায় ৭৫ শতাংশ গ্রাহক বিদ্যুৎহীন। বহু এলাকায় গাছ উপড়ে পড়েছে, ভেঙে গেছে বিদ্যুৎ খুঁটি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধারে কাজ চলছে, তবে আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় তা সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠছে। বরফে ঢেকে যাওয়া সড়কে উদ্ধারকর্মীদের চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় জরুরি সেবাদানকারী যানবাহন পৌঁছাতে পারছে না, ফলে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

নিউইয়র্ক সিটিতেও শীতের তীব্রতা চরমে। প্রবল তুষারপাতের সঙ্গে হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় বিপর্যস্ত মহানগরীর বাসিন্দারা। শহরের মেয়র জোহরান মামদানি জানিয়েছেন, গত আট বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে শীতল সময়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, শনিবার শহরে অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে, যদিও এসব মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। তীব্র ঠান্ডায় আশ্রয়হীন ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। শহরজুড়ে উষ্ণ আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, তবে চাহিদার তুলনায় তা পর্যাপ্ত কি না—সেই প্রশ্নও উঠছে।

শীতকালীন ঝড়ের প্রভাব পড়েছে শিক্ষা ও গণপরিবহন ব্যবস্থায়ও। নিউ ইংল্যান্ড থেকে শুরু করে দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্লাস বাতিল করেছে, অনেক ক্যাম্পাস সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে অনলাইনে পাঠদানের নির্দেশনা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। শার্লট শহরে তুষার ঝড়ের কারণে সব ধরনের গণপরিবহন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। বাস, ট্রেন ও ট্রাম চলাচল স্থগিত থাকায় কর্মজীবী মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

আকাশপথে বিপর্যয়ের মাত্রা আরও ভয়াবহ। রোববার একদিনেই ১৬ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। বড় বড় বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষা, বাতিল টিকিট ও পুনঃনির্ধারণের জট তৈরি হয়েছে। অনেক যাত্রী রাত কাটাচ্ছেন বিমানবন্দরের মেঝেতে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সংকট কাটবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে অন্তত ২৪টি অঙ্গরাজ্যে জরুরি সতর্কতা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফ্লোরিডা, দক্ষিণ-পূর্ব আলাবামা ও দক্ষিণ-পশ্চিম জর্জিয়ার কিছু অংশে টর্নেডো সতর্কতাও জারি করা হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একই সময়ে তুষারঝড় ও টর্নেডোর আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়ায় বিরল হলেও অসম্ভব নয়, আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই এমন চরমতা বাড়ছে।

মানবিক দিক থেকে এই দুর্যোগ সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে দরিদ্র ও আশ্রয়হীন জনগোষ্ঠীর ওপর। তীব্র ঠান্ডায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকা পরিবারগুলো গরমের ব্যবস্থা করতে পারছে না। অনেক এলাকায় পানির পাইপ জমে গিয়ে পানিসংকটও দেখা দিয়েছে। হাসপাতাল ও জরুরি সেবাগুলো ব্যাকআপ জেনারেটরের ওপর নির্ভর করে চলছে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসন একযোগে খাদ্য, কম্বল ও উষ্ণ পোশাক বিতরণে নেমেছে, তবে দুর্গম এলাকায় সহায়তা পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শীতকালীন ঝড় শুধু একটি আবহাওয়াজনিত ঘটনা নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্যও সতর্কবার্তা। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে অবকাঠামো এখনো এমন চরম শীত মোকাবিলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। বিদ্যুৎ গ্রিডের দুর্বলতা আবারও সামনে এসেছে। বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট প্রমাণ করছে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা ছাড়া এমন দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমানো কঠিন।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র আজ এক গভীর শীতল সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রাণহানি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া—সবকিছু মিলিয়ে এই ঝড় সাধারণ মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা ও ভয়ের ছায়া ফেলেছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোকে ফিরতে হবে স্বাভাবিক জীবনে। তবে এই দুর্যোগ হয়তো দীর্ঘদিন মনে করিয়ে দেবে—প্রকৃতির সামনে মানুষের প্রস্তুতি যতই উন্নত হোক, তা কখনোই যথেষ্ট নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত