প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যে ওয়াশিংটন একদিকে যেমন বিমানবাহী রণতরী ও যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে, অন্যদিকে বাড়াচ্ছে সেনা ও যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানও কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছে এবং নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করার বার্তা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পারস্য উপসাগর ও আশপাশের অঞ্চলে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইরানের তথাকথিত ‘ছায়া নৌবহর’ হিসেবে পরিচিত নয়টি জাহাজ এবং আরও আটটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এসব জাহাজ মূলত নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি তেল পরিবহনে ব্যবহৃত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যাকাণ্ড এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রেক্ষিতেই এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা জাহাজগুলোর মালিক বা ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ভারত, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বিভিন্ন কোম্পানির সংশ্লিষ্টতার কথাও উঠে এসেছে।
এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে আরও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিচ্ছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির বরাতে জানা গেছে, বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং তার সঙ্গে থাকা তিনটি ডেস্ট্রয়ার দক্ষিণ চীন সাগর ছেড়ে পশ্চিমমুখী যাত্রা শুরু করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নৌবাহিনী কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই নৌবহর বর্তমানে ভারত মহাসাগরে অবস্থান করছে এবং ইরানের কাছাকাছি পৌঁছালে বাহরাইনে নোঙর করা তিনটি উপকূলীয় যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে যুক্ত হবে। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরে আগে থেকেই টহলরত আরও দুটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বড় নৌবহর গঠন করবে।
ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের এই আগমনের ফলে প্রায় পাঁচ হাজার ৭০০ অতিরিক্ত মার্কিন সেনাসদস্য মধ্যপ্রাচ্যে যুক্ত হবে। এর বাইরে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি। এই ঘাঁটিতে বর্তমানে হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর এফ–১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে উপস্থিত রয়েছে। অনলাইন সামরিক বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্মগুলোর মতে, এসব যুদ্ধবিমান মোতায়েনের উদ্দেশ্য শুধু যুদ্ধ প্রস্তুতি বাড়ানো নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বার্তা দেওয়া। একইসঙ্গে যুক্তরাজ্যও এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা কাতারে টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। ফ্লাইট–ট্র্যাকিং ডেটা বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো লক্ষ্য করেছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কয়েক ডজন মার্কিন সামরিক কার্গো বিমানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটির দিকে যাত্রা করছে।
এই সামরিক তৎপরতার জবাবে ইরানও শক্ত অবস্থান নিয়েছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি জানায়, ইরানের আধাসামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের একজন শীর্ষ কমান্ডার যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্দেশে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল–ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম নুরনিউজের বরাতে বলা হয়, কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর বলেছেন, তার বাহিনী আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রস্তুত এবং তাদের ‘আঙুল ট্রিগারে’। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে উদ্দেশ করে বলেন, কোনো ভুল হিসাব যেন না করা হয়, কারণ ইরান তার সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগে প্রস্তুত।
ইরানের এই বক্তব্য কেবল সামরিক হুঁশিয়ারি নয়, বরং এটি একটি কূটনৈতিক বার্তাও বহন করে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো যেমন একটি শক্তির প্রদর্শন, তেমনি ইরানের কঠোর ভাষা নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ জনমত ও আঞ্চলিক মিত্রদের আশ্বস্ত করার কৌশল। তবে দুই পক্ষের এই শক্ত অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে একটি ভুল বোঝাবুঝি বা আকস্মিক সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পারস্য উপসাগর অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর। এখানে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক তেলবাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের সম্ভাবনা এখনো কম বলে মনে করা হলেও সামরিক তৎপরতা ও কড়া বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে ‘ছায়া নৌবহর’ নিয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ইরানের তেল রপ্তানিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা দেশটির অর্থনীতির ওপর বাড়তি প্রভাব ফেলবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উত্তেজনার পেছনে শুধু সামরিক বা নিরাপত্তাজনিত কারণই নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণও জড়িত। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যেমন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক উপস্থিতিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট দিন দিন গভীর হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো চায় না তাদের ভূখণ্ড বা জলসীমা কোনো বড় সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হোক। একই সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলো কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, মাঠের পরিস্থিতি এখনো উত্তপ্ত এবং সামরিক শক্তি প্রদর্শনের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি যে কোনো সময় নতুন মোড় নিতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের রণতরী, সেনা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন এবং ইরানের কড়া হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে এক অনিশ্চিত বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার না হলে এই উত্তেজনা শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়তে পারে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও।