দুই কোটি টাকার সেতু, উঠতে হয় মই বেয়ে: গালুয়ায় চরম দুর্ভোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৩ বার
দুই কোটি টাকার সেতু, উঠতে হয় মই বেয়ে: গালুয়ায় চরম দুর্ভোগ

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার গালুয়া গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতু, যা এলাকাবাসীর জন্য আশীর্বাদ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পরিণত হয়েছে নিত্যদিনের দুর্ভোগ ও ক্ষোভের প্রতীকে। সেতুটি দিয়ে যানবাহন চলাচলের স্বপ্ন দেখানো হলেও বাস্তবতায় সেখানে উঠতে হচ্ছে মই বেয়ে। দুই পাশেই নেই সংযোগ সড়ক। ফলে শিশু, নারী, বৃদ্ধ, রোগীসহ হাজারো মানুষ প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পায়ে হেঁটে এই সেতু পার হচ্ছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর মূল অবকাঠামোর কাজ শেষ। পিলার, গার্ডার, ঢালাই—সবই সম্পন্ন। কিন্তু দুই প্রান্তে সেতুর সঙ্গে যুক্ত করার মতো কোনো সড়ক নেই। এক পাশ থেকে কাঠের বা লোহার অস্থায়ী মই বসিয়ে মানুষ ওপরে উঠছে, অন্য পাশেও একই অবস্থা। যানবাহন তো দূরের কথা, রিকশা বা ভ্যানও উঠতে পারে না। সেতুর ওপর দাঁড়ালে বোঝা যায়, এটি যেন ব্যবহার না হওয়ার জন্যই পড়ে আছে।

স্থানীয়রা জানান, রাজাপুর উপজেলার গালুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসংলগ্ন এই সেতুটি এলাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন অন্তত দুই হাজারের বেশি মানুষ এই পথে চলাচল করে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছাড়াও আশপাশের গ্রামগুলোর মানুষকে বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উপজেলা সদরে যেতে এই পথ ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু প্রায় দুই বছর ধরে সেতুটি কার্যত অচল হয়ে থাকায় তাদের দুর্ভোগ যেন শেষই হচ্ছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল-ভান্ডারিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের গালুয়া বাজারের পাশে পুরোনো একটি সেতু ভেঙে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এক কোটি ৬২ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে নির্মাণকাজ শুরু হয়। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে সেতুর ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়। কিন্তু এরপর আর এগোয়নি সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ। ফলে পুরো প্রকল্পটি অসম্পূর্ণ রেখেই পড়ে আছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, সেতুর কাজ শেষ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হলেও সংযোগ সড়কের বিষয়টি কার্যত উপেক্ষিত। ফলে কাগজে-কলমে প্রকল্প শেষ হলেও বাস্তবে মানুষ কোনো সুফল পাচ্ছে না। বরং পুরোনো সেতু ভেঙে দেওয়ায় আগে যেখানে অন্তত ঝুঁকিপূর্ণ হলেও চলাচলের সুযোগ ছিল, এখন সেখানে নতুন করে দুর্ভোগ বেড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা হেয়ামুল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন হাসপাতালের রোগী, বৃদ্ধ মানুষ, নারী আর ছোট ছোট বাচ্চারা যাতায়াত করে। গাড়ি তো উঠতেই পারে না। অনেক সময় রোগীকে কাঁধে নিয়ে কিংবা হেঁটে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হয়। দুই বছর ধরে আমরা এই কষ্ট সহ্য করছি, কিন্তু দেখার কেউ নেই। এত টাকা খরচ করে যদি সেতু বানিয়েই ব্যবহার করতে না পারি, তাহলে লাভ কী?”

একই সুর শোনা যায় শিক্ষার্থীদের কথায়। কলেজ শিক্ষার্থী কাওছার হোসেন বলেন, “আমাদের স্কুল, মাদ্রাসা আর কলেজে যেতে এই পথ ব্যবহার করতে হয়। মই বেয়ে সেতুতে ওঠা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। বর্ষাকালে বা ভোরে কুয়াশার সময় ভয় আরও বেড়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছোট বাচ্চারা। যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সেতু নির্মাণের ঠিকাদার ছিলেন ঝালকাঠি জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সৈয়দ হাদিসুর রহমান মিলন। তিনি বর্তমানে একাধিক মামলার আসামি এবং একটি অস্ত্র মামলায় কারাগারে রয়েছেন বলে জানা গেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সেগুলোর কোনো সুরাহা হয়নি। ঠিকাদার আইনি জটিলতায় পড়ার পর প্রকল্পটি কার্যত ঝুলে যায়।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, বিষয়টি জানার পরও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। স্থানীয়রা একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করলেও শুধু আশ্বাস ছাড়া বাস্তব অগ্রগতি হয়নি। ফলে সেতুটি এখন এলাকাবাসীর কাছে ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজাপুর উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদার জনদুর্ভোগের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, এটি সত্য। ঠিকাদারের সমস্যার কারণে কাজ শেষ করা যায়নি। এখন নতুন করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করে অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রক্রিয়া শেষ হলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন, পুনঃদরপত্র আর প্রক্রিয়ার নামে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে? দুই বছর ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ব্যবহার করতে না পারার দায় কে নেবে? স্থানীয়দের মতে, শুধু আশ্বাস নয়, দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে অসুস্থ রোগী, অন্তঃসত্ত্বা নারী কিংবা স্কুলগামী শিশুদের জন্য এই সেতু প্রতিদিনই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সচেতন মহলের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি এলাকার দুর্ভোগের গল্প নয়; এটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিকল্পনার ঘাটতি, তদারকির অভাব এবং জবাবদিহিতার সংকটের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো যদি জনগণের কাজে না লাগে, তাহলে সেটি উন্নয়ন নয়, বরং অপচয় হিসেবেই বিবেচিত হবে।

সব মিলিয়ে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার গালুয়া গ্রামের এই সেতু এখন উন্নয়নের প্রতীক না হয়ে অব্যবস্থাপনার স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এলাকাবাসীর একটাই দাবি—দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে সেতুটি চলাচলের উপযোগী করা হোক, যাতে তাদের নিত্যদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটে এবং এত টাকা ব্যয়ের প্রকৃত সুফল মানুষ পায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত