প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনী জনসভায় তিনি ঘোষণা দেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রপতি থেকে ভিখারি—সব নাগরিকের জন্য একই বিচার ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে সমর্থক ও বিরোধী—দুই পক্ষেই তৈরি হয়েছে আলোচনা, বিশ্লেষণ ও নানা প্রশ্ন।
সোমবার কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে আয়োজিত জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে আইনের চোখে কেউ বিশেষ সুবিধাভোগী থাকবে না। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তি এবং সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষ—সবার জন্য একই আইন ও একই বিচার নিশ্চিত করা হবে। তাঁর ভাষায়, কোনো নাগরিকের প্রতি অবিচার করা হবে না এবং ন্যায়বিচারই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি।
জনসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে জামায়াত আমির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা ও গত এক দশকের বেশি সময়ের ঘটনাপ্রবাহের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে গুমের শিকার পরিবারগুলোই এখন দেশের সবচেয়ে বড় মজলুম। এসব পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। তাঁর মতে, যে জাতি মায়েদের সম্মান দিতে পারে না, তারা বিশ্ব দরবারে অপমানিত হয়। জামায়াত এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবে এবং সবার হাতে সম্মানজনক কাজ তুলে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে।
ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে দেশের সব সেক্টরে মৌলিক পরিবর্তন বা ‘বিপ্লব’ ঘটবে। তিনি কুষ্টিয়ার অর্থনীতির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, কুষ্টিয়া চিনিকল বন্ধ হয়ে থাকায় এই অঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষ ও কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১১ দলীয় ঐক্যের সরকার গঠিত হলে কুষ্টিয়া চিনিকল পুনরায় চালু করা হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্ম ও নারীরা আর পুরনো ও ‘বস্তাপঁচা’ রাজনীতিতে ফিরে যেতে চায় না, তারা পরিবর্তন চায়।
নারী অধিকার ও নিরাপত্তা প্রসঙ্গেও ডা. শফিকুর রহমান তার দলের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে বড় শহরগুলোতে নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু করা হবে, যাতে তারা নিরাপদে যাতায়াত করতে পারেন। তিনি ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, জামায়াতের কাছে এত তালা কেনার টাকা নেই যে নারীদের ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখা হবে। বরং নারীদের জন্য নিরাপদ সমাজ ও কর্মস্থল নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য। তাঁর মতে, যোগ্যতা অনুযায়ী কেউ যেন কোথাও বঞ্চিত না হয়—এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে।
বক্তব্যে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রসঙ্গও উঠে আসে। জামায়াত আমির বলেন, পদ্মা ও গড়াই এখন আর নদী নয়, মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, নদী বাঁচানোর নামে বরাদ্দ করা অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার না করে অপচয় ও দুর্নীতির মাধ্যমে জনগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে নদী রক্ষা ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক সহনশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৫ আগস্টের পর দেশ রক্ষার নামে জামায়াতের নেতাকর্মীরা রাস্তায় নামলেও অনেকে সেই সুযোগে দেশকে আরও অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে। তাঁর অভিযোগ, জামায়াত কারও বিরুদ্ধে অন্যায় মামলা না করলেও কিছু গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘মামলা বাণিজ্য’ শুরু করেছে। তিনি বলেন, যদি কেউ সংসার চালাতে চাঁদাবাজির মতো পথে যেতে বাধ্য হন, তবে তাদের সেই পথ ছেড়ে জামায়াতের আশ্রয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি—যাতে তারা সম্মানের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ পায়।
ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—জামায়াত নিজেদেরকে একটি ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের বিকল্প শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। সমান বিচার, সামাজিক নিরাপত্তা, নারীর মর্যাদা, পরিবেশ রক্ষা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ—এই বিষয়গুলোকে সামনে রেখে তারা ভোটারদের কাছে বার্তা দিতে চেষ্টা করছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নির্ভর করবে ক্ষমতায় গেলে তাদের নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা রক্ষার ওপর। সমান বিচারের কথা বলা সহজ হলেও বাস্তবে রাষ্ট্রপতি থেকে সাধারণ নাগরিক—সবার ক্ষেত্রে একই আইন প্রয়োগ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটে এটি কতটা কার্যকর হবে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এদিকে জনসভায় উপস্থিত জামায়াত সমর্থকেরা ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দেশে বৈষম্য, দুর্নীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। জামায়াত যদি সত্যিই সমান বিচার ও সম্মানের সমাজ গড়ে তুলতে পারে, তবে সেটি দেশের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে।
সব মিলিয়ে, কুষ্টিয়ার জনসভায় জামায়াত আমিরের বক্তব্য আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন—এসব ইস্যু সামনে এনে জামায়াত ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে। এখন দেখার বিষয়, ভোটাররা এই বার্তাকে কীভাবে গ্রহণ করেন এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে এর প্রভাব কতটা পড়ে।