প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
খেলাপি ঋণের লাগাম টানা এবং দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই করতে ব্যাংকিং খাত থেকে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের ঋণ নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়েছেন একটি শক্তিশালী, কার্যকর ও আস্থাভিত্তিক বন্ড মার্কেট গড়ে তোলার ওপর, যা ভবিষ্যতে করপোরেট অর্থায়নের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হতে পারে।
রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে ‘বন্ড মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রিকমেন্ডেশনস’ শীর্ষক সেমিনারে সোমবার দেওয়া বক্তব্যে গভর্নর বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে করপোরেট ঋণের ভার বহন করছে। এতে করে একদিকে খেলাপি ঋণের চাপ বেড়েছে, অন্যদিকে ব্যাংক ও অর্থনীতিতে কাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে করপোরেট খাতকে ধীরে ধীরে ব্যাংকনির্ভরতা থেকে আলাদা করে বন্ড মার্কেটমুখী করতে হবে।
গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে সিঙ্গেল বরোয়ার লিমিট বা একক গ্রাহক ঋণসীমা কঠোরভাবে মানা হবে। কোনোভাবেই এই সীমা অতিক্রম করতে দেওয়া হবে না। বর্তমানে কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক তার মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত একক কোনো গ্রাহক বা গ্রুপকে ঋণ দিতে পারে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ ফান্ডেড এবং ১০ শতাংশ নন-ফান্ডেড ঋণ হিসেবে নির্ধারিত। যদিও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সবুজ অর্থায়নের মতো কিছু খাতে এই সীমা শিথিল রয়েছে, তবুও সামগ্রিকভাবে বড় করপোরেট ঋণের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপের দিকেই যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গভর্নর এই নীতিকে ‘পুশ ফ্যাক্টর’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ সহজে না পেলে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প অর্থায়নের পথ খুঁজবে। সেই পথটি যেন বন্ড মার্কেট হয়, সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক করপোরেটদের সঙ্গে আলোচনা করবে এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করবে। বন্ড ইস্যুর প্রক্রিয়া সহজ করা, সময় কমানো এবং খরচ হ্রাস করার মতো উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা উভয়ের কাছেই বন্ড একটি আকর্ষণীয় মাধ্যম হয়ে ওঠে।
তিনি আরও বলেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ডমুখী করতে প্রণোদনা বা ইনসেনটিভ দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়েও ভাবার সময় এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ নিয়ে কাজ করছে এবং শিগগিরই বাস্তবসম্মত কিছু পদক্ষেপ সামনে আসতে পারে। গভর্নরের মতে, ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে পারলে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি যেমন কমবে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত্তি আরও মজবুত হবে।
সেমিনারে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) যৌথ গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা এজাজুল ইসলাম। গবেষণা প্রতিবেদনে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে বন্ড মার্কেট উন্নয়নের নানা দিক তুলে ধরা হয়। সেখানে সুপারিশ করা হয়, সরকারি বন্ড কেনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি ‘ওয়ান স্টপ’ সার্ভিস ডেস্ক চালু করা যেতে পারে, যেখানে সরাসরি ও অনলাইনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষও সহজে বন্ড কিনতে পারবেন।
গভর্নর তার বক্তব্যে বৈশ্বিক অর্থনীতির উদাহরণ টেনে বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশে আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তি হলো বন্ড মার্কেট, এর পরেই পুঁজিবাজার এবং সবশেষে মানি মার্কেট। কিন্তু বাংলাদেশে চিত্রটি ঠিক উল্টো। এখানে মানি মার্কেট সবচেয়ে প্রভাবশালী, আর বন্ড মার্কেট এখনো পিছিয়ে। এই অবস্থার পরিবর্তন আনতে হলে সরকার, ব্যবসায়ী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। গভর্নরের মতে, সরকারের ঋণই হতে পারে বন্ড মার্কেটের বিকাশের প্রধান চালিকা শক্তি। সরকার যদি সক্রিয়ভাবে বন্ড ইস্যু করে এবং সেগুলোকে কার্যকরভাবে বাজারে আনে, তাহলে বন্ড মার্কেট স্বাভাবিকভাবেই প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।
মুদ্রাবাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ার প্রবণতা কমেছে, ফলে মুদ্রাবাজার কিছুটা স্থিতিশীল হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণের বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্রের বাজার রয়েছে। এই সঞ্চয়পত্রগুলোকে সহজেই সেকেন্ডারি মার্কেটে আনা সম্ভব। সেগুলো ট্রেডেবল করা গেলে রাতারাতি বন্ড মার্কেটের আকার দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে।
তবে বন্ড মার্কেট বড় করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা। গভর্নর স্পষ্টভাবে বলেন, বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস করতে হবে যে, প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো সুদসহ মূল অর্থ ফেরত দেবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাকে খেলাপি হিসেবে গণ্য করা হবে। এই কঠোর অবস্থানই বন্ড মার্কেটে শৃঙ্খলা ও বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিনি আরও বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন ব্যবস্থাকেও ধীরে ধীরে ফান্ডভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করা যেতে পারে, যেখানে পেনশন প্রদানের জন্য বন্ড একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এতে একদিকে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি দায় ব্যবস্থাপনা সহজ হবে, অন্যদিকে বন্ড মার্কেটও গভীরতা পাবে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকঋণের ১৬ শতাংশ সুদহারকে বন্ড মার্কেট উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল না হলে বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করা কঠিন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে এবং সুদের হার যুক্তিসংগত পর্যায়ে নামাতে হবে। তাঁর মতে, অর্থনীতিকে পুরোপুরি স্থিতিশীল করা গেলে আগামী ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যেই একটি কার্যকর ও আস্থাভিত্তিক বন্ড মার্কেট গড়ে তোলা সম্ভব।
সেমিনারে বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, ব্যাংক থেকে যদি খুব সহজে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পেয়ে যায়, তাহলে তারা পুঁজিবাজার বা বন্ড মার্কেটে আসতে আগ্রহী হবে না। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিয়ে আসছে, যেখানে সম্পদ ও দায়ের মধ্যে বড় ধরনের অসংগতি তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, আপাতত বন্ড মার্কেট উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্ব থাকলেও ভবিষ্যতে এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুঁজিবাজারের অধীনে চলে যাবে। লক্ষ্য হলো অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে ব্যাংকনির্ভরতা থেকে পুঁজিবাজারনির্ভর ব্যবস্থায় রূপান্তর করা।
সেমিনারে অর্থ বিভাগের সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ট্রেজারি বন্ড সেকেন্ডারি মার্কেটে আনা হলেও বিভিন্ন ধাপে কর আদায়ে সফটওয়্যারগত সমস্যার কারণে জটিলতা দেখা দিয়েছে। এই সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি ও অর্থ মন্ত্রণালয় একসঙ্গে কাজ করছে। একই সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের সিলিং তুলে দেওয়ার বিষয়েও অর্থ মন্ত্রণালয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বন্ড মার্কেটে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত প্যানেল আলোচনায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, বিএসইসি কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিন অংশ নেন। আলোচনায় বন্ড মার্কেট উন্নয়নের বাস্তব চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য করণীয় নিয়ে বিস্তারিত মতামত উঠে আসে।