প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ ফিলিপাইনের উপকূলে উত্তাল সমুদ্রে ভয়াবহ এক নৌদুর্ঘটনায় অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার ভোরে ৩৫০ জনের বেশি যাত্রী বহনকারী একটি যাত্রীবাহী ফেরি ডুবে গেলে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর থেকে এখনো অন্তত ২৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির কোস্টগার্ড। উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় হতাহতদের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ‘এমভি ত্রিশা কেরস্টিন–৩’ নামের তিনতলাবিশিষ্ট ফেরিটি স্থানীয় সময় রাত ১টা ৫০ মিনিটে বিপৎসংকেত পাঠায়। তার প্রায় চার ঘণ্টা আগেই ফেরিটি দক্ষিণ মিন্দানাও অঞ্চলের জাম্বোয়াঙ্গা সিটি বন্দর থেকে বাসিলান প্রদেশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল। যাত্রার কিছু সময় পর থেকেই সমুদ্র উত্তাল হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে ফেরিটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডুবে যায়।
ফিলিপাইনের কোস্টগার্ড জানায়, দুর্ঘটনাটি ঘটে বাসিলান প্রদেশের বালুক-বালুক দ্বীপের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী এবং স্থানীয় উদ্ধারকারী দলগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। এখন পর্যন্ত অন্তত ৩১৭ জন যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে রাতের অন্ধকার, উত্তাল সাগর এবং সীমিত জনবলের কারণে উদ্ধার কার্যক্রমে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে উদ্ধারকারীদের।
বাসিলান প্রদেশের গভর্নরের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, উদ্ধার হওয়া যাত্রীরা খালি পায়ে, কম্বলে মোড়া অবস্থায় স্ট্রেচারে করে তীরে আনা হচ্ছে। অনেকের চোখেমুখে আতঙ্ক, কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। নিহতদের মরদেহ বডি ব্যাগে করে সরিয়ে নেওয়ার দৃশ্য এলাকাজুড়ে শোকের আবহ তৈরি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধারকাজে সহায়তা করতে এগিয়ে এলেও পরিস্থিতির ভয়াবহতায় অনেকেই অসহায় বোধ করছেন।
ইসাবেলা সিটির এক উদ্ধারকর্মী শেরিল বালোনদো জানান, দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনদের ফোনে তাদের দপ্তর কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত আমরা শতাধিক ফোনকল পেয়েছি। সবাই তাদের প্রিয়জনের খোঁজ জানতে চাইছেন। উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় এখনো নিখোঁজ ও নিহতদের একটি চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা সম্ভব হয়নি।” তার ভাষায়, প্রতিটি ফোনকলই ছিল উদ্বেগ ও আতঙ্কে ভরা।
কোস্টগার্ডের মুখপাত্র নোএমি কায়াবিয়াব জানান, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী দুর্ঘটনার সময় সমুদ্র ছিল অত্যন্ত উত্তাল। প্রবল ঢেউ এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফেরিটি ভারসাম্য হারায় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে বিস্তারিত তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করা হবে না।
এদিকে বাসিলানের জরুরি উদ্ধার দপ্তরের কর্মকর্তা রোনালিন পেরেজ জানান, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক উদ্ধারপ্রাপ্ত ও আহতকে সামলাতে গিয়ে উদ্ধারকারীরা জনবল সংকটে পড়েছেন। অন্তত ১৮ জনকে গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক, যাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
দক্ষিণ মিন্দানাও অঞ্চলের কোস্টগার্ড কমান্ডার রোমেল দুয়া বলেন, “এই মুহূর্তে আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার উদ্ধার কার্যক্রম। নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে সব ধরনের সম্পদ কাজে লাগানো হচ্ছে।” তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণে একটি সামুদ্রিক তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর জোরদার করা হবে।
কোস্টগার্ডের দাবি অনুযায়ী, ফেরিটি অতিরিক্ত যাত্রী বহন করছিল না এবং যাত্রার আগে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে অনেকেই এই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। বিশেষ করে একই রুটে এর আগেও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৩ সালে একই রুটে চলাচলকারী ‘লেডি মেরি জয়–৩’ নামের আরেকটি ফেরিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৩১ জন নিহত হয়েছিল। ওই দুর্ঘটনাও দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। দুইটি জাহাজই স্থানীয় অ্যালেসন শিপিং লাইন্সের মালিকানাধীন হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে অ্যালেসন শিপিং লাইন্স এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা জাহাজে থাকা সবার নিরাপত্তা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং কোস্টগার্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে কাজ করছে।
ফিলিপাইন একটি দ্বীপরাষ্ট্র, যেখানে সাত হাজারের বেশি দ্বীপ রয়েছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতের জন্য নৌপথই প্রধান ভরসা। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ফেরি ও নৌযানে ভ্রমণ করেন। তবে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, পুরোনো নৌযান এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে প্রায়ই নৌদুর্ঘটনার খবর আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শন এবং কঠোর আইন প্রয়োগ না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা কঠিন।
ইতিহাস বলছে, ফিলিপাইনে নৌদুর্ঘটনার ভয়াবহ নজির রয়েছে। ১৯৮৭ সালে ‘ডোনা পাজ’ নামের একটি ফেরি দুর্ঘটনায় চার হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, যা শান্তিকালে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ সামুদ্রিক দুর্ঘটনা হিসেবে পরিচিত। সেই ঘটনার পর নিরাপত্তা জোরদারের নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে তার পূর্ণ প্রতিফলন এখনও দেখা যায়নি বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
এই সাম্প্রতিক ফেরিডুবির ঘটনা আবারও ফিলিপাইনের নৌযান নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনে দিয়েছে। নিহত ও নিখোঁজদের পরিবার এখন উৎকণ্ঠা আর শোকে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ প্রিয়জনের খোঁজে হাসপাতাল থেকে উদ্ধারকেন্দ্র ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কেউ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে অলৌকিক কোনো আশার অপেক্ষায় রয়েছেন।
এই সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সংগৃহীত। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসন্ধান করে এবং অনলাইন তথ্য-উপাত্ত বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিষয়বস্তুর সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। সংবাদটি পেশাদারিত্ব, দায়বদ্ধতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, দক্ষিণ ফিলিপাইনের এই ফেরিডুবি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি দেশটির নৌপরিবহন ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর একটি করুণ স্মারক। উদ্ধার অভিযান শেষ হলে তদন্তের ফলাফল কী আসে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক মহল।