শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তামাকমুক্ত ও স্বাস্থ্যবান্ধব পরিবেশে মাউশির কঠোর নির্দেশনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৩ বার
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তামাকমুক্ত ও স্বাস্থ্যবান্ধব পরিবেশে মাউশির কঠোর নির্দেশনা

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ, কর্মক্ষম ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের স্বাস্থ্যবান্ধব উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, তামাক নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনাচার নিশ্চিত করতে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অফিসের জন্য নতুন ও কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। এই নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর করার কথা জানিয়ে মাউশি স্পষ্ট করেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর কেবল জ্ঞানচর্চার জায়গা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের সুস্থ জীবনযাপনের ভিত্তি তৈরির অন্যতম কেন্দ্র।

সোমবার ২৬ জানুয়ারি মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। এর আগে রোববার ২৫ জানুয়ারি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেশের সব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা অফিস ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে পাঠানো হয়। সরকারের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে জারি করা এই নির্দেশনায় শিক্ষা ব্যবস্থাকে স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নের কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করার স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত পণ্য বিক্রয়, ব্যবহার ও প্রচার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর আওতায় সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুলসহ সব ধরনের তামাকজাত দ্রব্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে। শুধু তাই নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে বা আশপাশে তামাক কোম্পানির কোনো ধরনের বিজ্ঞাপন, প্রচারণা বা পৃষ্ঠপোষকতাও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) অনুসারে এই বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে শিশু ও কিশোরদের তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করা যায়।

মাউশির আদেশে বলা হয়েছে, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা অফিসকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘তামাকমুক্ত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমান স্থানে তামাকমুক্ত সাইনেজ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে এবং তামাকবিরোধী সামাজিক বার্তা আরও জোরালো হবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

শুধু তামাক নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ নয়, নতুন নির্দেশনায় শিক্ষার্থীদের পুষ্টি ও খাদ্যাভ্যাসের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নির্দেশনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং উচ্চ চিনিযুক্ত পানীয়ের বিপণন ও সহজলভ্যতা সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। ফাস্টফুড, অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও ট্রান্স-ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার শিশু-কিশোরদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ—এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের ব্যবস্থা করতে ‘হেলদি ক্যান্টিন’ স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছে মাউশি।

নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ক্যান্টিন বা খাবার সরবরাহকারীদের ক্ষেত্রে স্বল্প লবণ ও স্বল্প চিনিযুক্ত খাবার নিশ্চিত করতে হবে এবং ট্রান্স-ফ্যাটমুক্ত খাদ্য পরিবেশন করতে হবে। এমনকি সরকারি সভা, সেমিনার বা দাপ্তরিক অনুষ্ঠানের ক্যাটারিংয়েও পরিবর্তন আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে এসব আয়োজনে তাজা ফল, বাদাম ও স্বাস্থ্যকর স্ন্যাক্স সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এর মাধ্যমে শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

শারীরিক সক্ষমতা ও সক্রিয় জীবনযাপনের ওপরও বিশেষ জোর দিয়েছে মাউশি। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার শারীরিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। খেলাধুলা, শরীরচর্চা বা সংগঠিত ব্যায়ামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক পরিবেশ তৈরির কথা বলা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ নেই, সেখানে ইনডোর কার্যক্রমের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে জায়গার সীমাবদ্ধতা স্বাস্থ্যচর্চার অন্তরায় না হয়।

এছাড়া শিশুদের জন্য সাঁতার শেখানোর উদ্যোগ গ্রহণের কথাও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, যা শুধু শারীরিক সুস্থতার জন্য নয়, বরং দুর্ঘটনা প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষক ও কর্মীদের দীর্ঘ সময় বসে কাজ করার ফলে যে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, তা কমাতে প্রতি ঘণ্টায় ডেস্ক-ভিত্তিক স্ট্রেচিং ব্যায়াম চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনায় অবকাঠামোগত দিকটিও গুরুত্ব পেয়েছে। সরকারি অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়স্কবান্ধব সিঁড়ি, র‌্যাম্প ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। লিফট ব্যবহারের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া, সাইক্লিংয়ের মতো পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত যাতায়াত ব্যবস্থা জনপ্রিয় করা এবং দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার অভ্যাস পরিহারে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে একটি সামগ্রিক স্বাস্থ্যবান্ধব জীবনাচার গড়ে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য।

মাউশি জানিয়েছে, এই নির্দেশনাসমূহ অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে এবং প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অফিসকে তাদের গৃহীত কার্যক্রমের নিয়মিত বাস্তবায়ন প্রতিবেদন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের বিশেষ শিক্ষা শাখায় পাঠাতে হবে। এর মাধ্যমে নির্দেশনার বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।

মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, সরকারের এই উদ্যোগের ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্থূলতা ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারবে, যা ভবিষ্যতে একটি সুস্থ-সবল ও উৎপাদনশীল জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন সমন্বিত স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়ন করা গেলে এর ইতিবাচক প্রভাব শুধু শিক্ষার্থী নয়, পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়বে। তামাকমুক্ত পরিবেশ, পুষ্টিকর খাদ্য, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অবকাঠামো—এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত