প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শহর যত বড় হচ্ছে, মানুষের চলাচলের চাহিদাও তত দ্রুত ও জটিল হয়ে উঠছে। রাস্তার ওপর যানজট, দূষণ আর সময় নষ্ট—এই তিন সমস্যার সমাধান খুঁজতেই বিশ্বজুড়ে নগর পরিকল্পনাবিদেরা বিকল্প গণপরিবহনের দিকে ঝুঁকছেন। সেই বিকল্পগুলোর মধ্যে মনোরেল এখন অনেক দেশের শহরে কার্যকর ও জনপ্রিয় একটি পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। এক রেলের ওপর চলা এই আধুনিক ট্রেনব্যবস্থা প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব দিক এবং নগরের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার কারণে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মনোরেল বলতে বোঝায় এমন এক ধরনের রেলব্যবস্থা, যেখানে ট্রেনটি একটি মাত্র রেলের ওপর দিয়ে চলে। এই রেল সাধারণত উঁচু খুঁটির ওপর বসানো থাকে, ফলে নিচের সড়কব্যবস্থার সঙ্গে এর কোনো সংঘর্ষ হয় না। ট্রেনটি বৈদ্যুতিক শক্তিতে চলে, তাই এতে ধোঁয়া বা সরাসরি কার্বন নিঃসরণ নেই। আধুনিক মনোরেলগুলো এমনভাবে নকশা করা হয়, যাতে শব্দদূষণও তুলনামূলকভাবে কম থাকে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই একে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
মনোরেলের কার্যপ্রণালি মূলত বিম-ভিত্তিক। একক রেল বা কংক্রিট বিমের ওপর ট্রেনের চাকা বা গ্রিপিং সিস্টেম স্থাপন করা থাকে, যা ট্রেনকে ভারসাম্য ও গতি দেয়। যেহেতু এটি সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত, তাই জ্বালানি পোড়ানোর প্রয়োজন নেই। ফলে শহরের বাতাস দূষণের আশঙ্কা কমে আসে। একই সঙ্গে উঁচু পথে চলার কারণে ট্রাফিক সিগন্যাল, মোড় কিংবা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও থাকে না।
বিশ্বের অনেক শহরে মনোরেলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হিসেবে দেখা হয় এর সময়নিষ্ঠতা ও নিরাপত্তাকে। যানজটের ওপর দিয়ে নির্বিঘ্নে চলতে পারায় যাত্রীদের নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সহজ হয়। নির্মাণের ক্ষেত্রেও মনোরেল তুলনামূলক কম জায়গা নেয়। যেখানে পুরো মেট্রো রেল নির্মাণের জন্য বড় পরিসরের জমি ও দীর্ঘ সময় দরকার হয়, সেখানে মনোরেল অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত স্থাপন করা সম্ভব। তবে এর সীমাবদ্ধতাও আছে। শুরুতে নির্মাণ ব্যয় বেশ বেশি, যাত্রী ধারণক্ষমতা মেট্রোর তুলনায় কম এবং একবার রুট স্থাপন হয়ে গেলে তা পরিবর্তন করা বেশ কঠিন।
এই সব সুবিধা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেই কিছু দেশ মনোরেলকে তাদের নগর পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তুলেছে। জাপানকে বলা হয় মনোরেলের সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী দেশ। টোকিও, ওসাকা, চিবা ও কিতাকিউশুর মতো শহরে মনোরেল বহু বছর ধরে সফলভাবে চলছে। জাপানের মনোরেল ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে সময়নিষ্ঠতা ও নিরাপত্তার উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী নির্ভরযোগ্যভাবে গন্তব্যে পৌঁছান, যা জাপানের গণপরিবহনের শৃঙ্খলা ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের প্রতিফলন।
চীনে মনোরেলের ব্যবহার ভিন্ন একটি বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। চংকিং শহরের মনোরেলকে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত মনোরেল লাইন হিসেবে ধরা হয়। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার কারণে এখানে প্রচলিত মেট্রো বা সড়ক সম্প্রসারণ অনেক জায়গায় কঠিন। সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই মনোরেল কার্যকর সমাধান হিসেবে উঠে এসেছে। ভবনের ফাঁক দিয়ে, পাহাড় কেটে না ফেলে উঁচু পথে চলা এই ট্রেন শহরের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ও ইনচন অঞ্চলেও মনোরেল ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানে মনোরেলকে মূলত শহরের নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক পরিবহন হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে, যা বড় মেট্রো নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত। এতে যাত্রীদের যাতায়াত আরও সহজ হয়েছে এবং শহরের ভেতরে ছোট দূরত্বে দ্রুত চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় থাইল্যান্ডের ব্যাংকক মনোরেলের একটি পরিচিত উদাহরণ। যানজটপ্রবণ এই শহরে মনোরেল নগর জীবনে বড় পরিবর্তন এনেছে। ব্যস্ত সড়কের ওপর দিয়ে চলা এই ট্রেন প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে সময় বাঁচাতে সহায়তা করছে। অফিসগামী মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী ও পর্যটক—সবাই মনোরেলের সুবিধা নিচ্ছেন। একই সঙ্গে এটি শহরের গণপরিবহনে একটি আধুনিক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে।
মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে মনোরেল শহরের গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠেছে। এটি শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য নয়, পর্যটকদের কাছেও জনপ্রিয়। শহরের কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোকে সংযুক্ত করে মনোরেল কুয়ালালামপুরের পর্যটন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
সিঙ্গাপুরে মনোরেল ও এলআরটি ব্যবস্থাকে মূলত শহরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে ব্যবহার করা হয়। ছোট আকারের হলেও এই ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর। সিঙ্গাপুরের পরিকল্পিত নগরায়ণের সঙ্গে মানানসই এই পরিবহনব্যবস্থা বাস ও মেট্রোর চাপ কমাতে সহায়তা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে মনোরেলের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ লাস ভেগাস মনোরেল। পর্যটননির্ভর এই শহরে হোটেল, কনভেনশন সেন্টার ও বিনোদন এলাকার মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে এটি বড় ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া সিয়াটল ও ডিজনিল্যান্ড এলাকাতেও মনোরেলের ব্যবহার দেখা যায়, যেখানে এটি শহরের প্রতীকী পরিবহন হিসেবেও পরিচিত।
ইউরোপে জার্মানির ভুপারটাল শহরের মনোরেল একেবারেই ভিন্ন ধরনের ইতিহাস বহন করে। শত বছরেরও বেশি পুরোনো এই ঝুলন্ত মনোরেল আজও চালু রয়েছে। প্রযুক্তিগত দিক থেকে আধুনিক মনোরেলের সঙ্গে এর পার্থক্য থাকলেও এটি প্রমাণ করে যে মনোরেল ধারণাটি নতুন নয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকার সক্ষমতা এর রয়েছে।
বিশ্বের এই অভিজ্ঞতাগুলো দেখায়, মনোরেল কোনো একক সমাধান নয়, বরং নির্দিষ্ট নগর বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া একটি পরিবহন মডেল। যেখানে জায়গার সংকট, যানজট ও পরিবেশগত চাপ বেশি, সেখানে মনোরেল কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে নগর পরিবহন পরিকল্পনায় মনোরেল কতটা সম্ভাবনাময় হতে পারে, তা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, যাত্রী চাহিদা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর। তবে এক রেলের এই ট্রেন যে আধুনিক শহরের যাতায়াত ভাবনায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে, তা বিশ্বব্যাপী এর জনপ্রিয়তাই স্পষ্ট করে।