প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে নীরবে কিন্তু দ্রুতগতিতে বাড়ছে কিডনি রোগীর সংখ্যা। আধুনিক জীবনযাপন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং স্বাস্থ্য বিষয়ে পর্যাপ্ত সচেতনতা না থাকাই এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই বাস্তবতা সামনে রেখে টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইফস্টাইল, খাদ্যাভ্যাস ও কিডনি রোগ বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষাঙ্গনে আয়োজিত এই সেমিনার শুধু তথ্যভিত্তিক আলোচনা নয়, বরং সুস্থ জীবনযাপনের বিষয়ে নতুন করে ভাবনার খোরাক জুগিয়েছে অংশগ্রহণকারীদের।
সোমবার ২৬ জানুয়ারি দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এই সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল আজীম আখন্দ। তিনি বলেন, কিডনি রোগ এমন একটি সমস্যা, যা অনেক সময় প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে না। ফলে রোগীরা যখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, তখন অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। অস্বাস্থ্যকর জীবনধারা ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ভাইস চ্যান্সেলর আরও বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শুধু হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। বরং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়। তরুণ প্রজন্মের মধ্যেই স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে কিডনি রোগসহ নানা জীবনযাপনজনিত রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রোটারি ক্লাব অব টাঙ্গাইল সিটি, রোটার্যাক্ট ক্লাব অব মাওলানা ভাসানী এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন রোটারি ক্লাব অব টাঙ্গাইল সিটির সভাপতি রোটারিয়ান সামছুল আলম শিবলী। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, কিডনি রোগ প্রতিরোধে সমাজভিত্তিক উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। রোটারির মতো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো এ ক্ষেত্রে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জ্ঞানকেন্দ্রে এ ধরনের আয়োজন ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি করবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সেমিনারে প্রোগ্রাম চেয়ার হিসেবে বক্তব্য রাখেন অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক রোটারিয়ান ড. নজমুস সাদেকীন। তিনি বলেন, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একটি দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে তার প্রভাব পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। কিডনি রোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক পরিবার আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই প্রতিরোধমূলক সচেতনতা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রিসোর্স পারসন হিসেবে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক রোটারিয়ান ড. শহীদুল্লাহ কায়সার, যিনি অর্থোপেডিকস ও ট্রমাটোলজি বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন। তিনি তার উপস্থাপনায় বলেন, অনেক রোগীর ক্ষেত্রে কিডনি সমস্যার সঙ্গে অন্যান্য জীবনযাপনজনিত জটিলতা যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতার সম্পর্ক রয়েছে। নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে এসব ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরেন।
আরেক রিসোর্স পারসন হিসেবে বক্তব্য দেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আশেকুল ইসলাম। তিনি কিডনির কার্যপ্রণালি এবং দৈনন্দিন জীবনে খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। পর্যাপ্ত পানি পান, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণে সতর্কতা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা যে কিডনি সুস্থ রাখার ক্ষেত্রে কতটা জরুরি, সে বিষয়েও তিনি আলোকপাত করেন।
সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. ইমাম হোসেন, রোটারি ক্লাব অব টাঙ্গাইল সিটির সেক্রেটারি রোটারিয়ান মোহাম্মদ আব্দুল জলিল এবং পাস্ট সেক্রেটারি রোটারিয়ান আরিফুল ইসলাম। তাঁদের বক্তব্যে শিক্ষাঙ্গনে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, শিক্ষার্থী জীবনে গড়ে ওঠা অভ্যাসই পরবর্তী জীবনে সুস্থ বা অসুস্থ থাকার ভিত্তি তৈরি করে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন রোটার্যাক্ট ক্লাব অব মাওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলের প্রেসিডেন্ট রোটার্যাক্টর সাকিব হাসান খান। তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় পুরো সেমিনারটি ছিল প্রাণচাঞ্চল্যপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, রোটারিয়ান ও রোটার্যাক্ট সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে সম্মেলনকক্ষ ছিল পরিপূর্ণ।
বক্তারা একমত পোষণ করে বলেন, কিডনি রোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত পানি পান এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে এ ধরনের সেমিনার ও আলোচনা সভা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এ ধরনের আয়োজন ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পরিসরে করার আহ্বানও জানানো হয়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে আয়োজিত এই সেমিনার নিয়ে সংবাদটি প্রস্তুত করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, বরং সুস্থ জীবনযাপনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি মানবিক প্রয়াস। কিডনি রোগের মতো নীরব ঘাতক প্রতিরোধে সচেতনতা যে সবচেয়ে বড় অস্ত্র, এই সেমিনার তা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে।