কলকাতায় মোমোর গুদামে ভয়াবহ আগুন, নিহত ৭, নিখোঁজ অন্তত ২০

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৬ বার
কলকাতায় মোমোর গুদামে ভয়াবহ আগুন, নিহত ৭, নিখোঁজ অন্তত ২০

প্রকাশ: ২৭  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় একটি মোমো প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় এখনো অন্তত ২০ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও দমকল বিভাগ। নিহতদের বেশির ভাগের মরদেহ সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যাওয়ায় তাদের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকাজ ও আগুন নেভানোর কার্যক্রম একসঙ্গে চলায় ঘটনাস্থলে চরম উৎকণ্ঠা ও শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে।

পূর্ব কলকাতার আনন্দপুর থানার নাজিরাবাদ এলাকায় সোমবার গভীর রাতে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক তিনটার দিকে প্রথমে একটি গুদাম থেকে আগুনের লেলিহান শিখা উঠতে দেখা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই পাশের আরেকটি গুদামে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দুইটি গুদামই একটি মোমো উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বলে নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। গুদাম দুটিতে বিপুল পরিমাণ সফট ড্রিংকস, শুকনো খাবার, প্যাকেটজাত খাদ্যসামগ্রী এবং দাহ্য উপকরণ মজুত ছিল, যা আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দমকল বিভাগ জানায়, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একাধিক ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে গুদামের ভেতরে থাকা দাহ্য সামগ্রী এবং সংকীর্ণ প্রবেশপথের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যাপক বেগ পেতে হয়। সোমবার রাত পেরিয়ে গেলেও আগুন পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়নি। মঙ্গলবার সকালেও ধোঁয়া ও আগুনের ছোট ছোট শিখা দেখা যায়। টানা কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এলেও পুরোপুরি নির্বাপণ ও কুলিং কার্যক্রম সম্পন্ন করতে আরও সময় লাগে বলে জানায় দমকল কর্তৃপক্ষ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আগুন লাগার সময় গুদামের ভেতরে প্রায় ৩০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। তাদের মধ্যে মাত্র কয়েকজন কোনোভাবে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। বাকিদের একটি বড় অংশ এখনো নিখোঁজ। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে গুদামের ভেতরের তাপমাত্রা এবং ধসে পড়া কাঠামোর কারণে উদ্ধারকাজ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

উদ্ধার করা মরদেহগুলোর অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মরদেহগুলোর ভিসেরা সংগ্রহ করে ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে। এ ছাড়া নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মৃত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের অধিকাংশই ভিনরাজ্য থেকে আসা অস্থায়ী শ্রমিক হতে পারেন।

ঘটনার পরপরই পশ্চিমবঙ্গের দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা। কীভাবে আগুন লাগল এবং রাতে এতসংখ্যক শ্রমিক সেখানে কেন ছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুটি বড় গুদাম একসঙ্গে ছিল, যেখানে দাহ্য সামগ্রী মজুত ছিল। নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হবে।” তিনি আরও জানান, যদি কোনো ধরনের অবহেলা বা নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই অগ্নিকাণ্ডকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনেও শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার রাজ্য সরকারের কড়া সমালোচনা করে বলেন, পশ্চিমবঙ্গকে কার্যত একটি “জতুগৃহে” পরিণত করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “প্রায় প্রতি মাসেই কোথাও না কোথাও বোমা বিস্ফোরণ, অবৈধ বাজি কারখানায় আগুন কিংবা বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতির কারণেই এসব ঘটনা বারবার ঘটছে।” তিনি অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, গুদামটি আবাসিক এলাকার একেবারে ভেতরে অবস্থিত হলেও দীর্ঘদিন ধরে সেখানে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কোনো তদারকি ছিল না। সংকীর্ণ রাস্তা, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকা এবং জরুরি বহির্গমন পথের অভাব আগুনে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে তারা মনে করছেন। অনেক বাসিন্দা রাতের আঁধারে আগুন লাগার পর বিকট শব্দ এবং বিস্ফোরণের মতো আওয়াজ শোনার কথাও জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বা সংরক্ষণকারী গুদামগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত পরিদর্শন, বৈধ লাইসেন্স, বৈদ্যুতিক সংযোগের মান যাচাই এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ না থাকলে এ ধরনের দুর্ঘটনা অনিবার্য হয়ে ওঠে। কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে আবাসিক এলাকায় বড় গুদাম পরিচালনার বিষয়টিও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

এই ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন। তারা নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের দাবি উঠেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হলেও নির্দিষ্ট অঙ্ক এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

কলকাতার এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড আবারও শহরের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, অবৈধ বা অপর্যাপ্তভাবে পরিচালিত গুদাম ও কারখানার ঝুঁকি এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে ধরেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রশাসন। উদ্ধারকাজ সম্পূর্ণ হলে নিখোঁজদের প্রকৃত সংখ্যা ও দুর্ঘটনার পূর্ণ চিত্র পরিষ্কার হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত