নয়-ছয়ের সুদে অর্থনীতি ঘুরবে না: গভর্নরের স্পষ্ট বার্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬১ বার
নয়-ছয়ের সুদে অর্থনীতি ঘুরবে না: গভর্নরের স্পষ্ট বার্তা

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চাপিয়ে দেওয়া নয়-ছয় শতাংশ সুদের হারে দেশের অর্থনীতি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না—এমন স্পষ্ট ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেছেন, বর্তমান বাস্তবতায় বাজারভিত্তিক সুদের হারই হবে আর্থিক খাত পুনরুদ্ধারের একমাত্র টেকসই পথ। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নির্ধারিত কৃত্রিম সুদহার দিয়ে অর্থনীতিকে সচল করা সম্ভব নয়।

মঙ্গলবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘আইসিসি রাউন্ড টেবিল অন ইমপ্লিকেশনস অফ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ফর ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি: বাংলাদেশ পারস্পেকটিভ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা উপস্থিত ছিলেন।

গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বর্তমানে সুদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও সেটি বাস্তবতার প্রতিফলন। অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় চাপিয়ে দেওয়া নয়-ছয় শতাংশ সুদের হার সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “সুদের হার এই মুহূর্তে বেশি, কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে এবং বাজারের বাস্তবতায় বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে যাবে। তবে রাজনৈতিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া নয়-ছয়ের সুদের হারে আর্থিক খাত আর কখনোই ফিরে যাবে না।”

তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাজারভিত্তিক সুদের হার কার্যকর করতে হলে প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনা। উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিবেশে কৃত্রিমভাবে কম সুদহার ধরে রাখা মানে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ভারসাম্য নষ্ট করা। এতে একদিকে আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি বেড়ে যায়।

গভর্নরের মতে, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হোক বা না হোক, বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য কিছু মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। তিনি বলেন, “উন্নয়নের স্বার্থেই আমাদের মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে, বৈদেশিক মুদ্রার দামে স্থিতিশীলতা আনতে হবে, খেলাপি ঋণ কমাতে হবে এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে রিজার্ভকে শক্ত অবস্থানে নিতে হবে। এগুলো আলাদা কোনো লক্ষ্য নয়, বরং সার্বিক উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ।”

খেলাপি ঋণের প্রসঙ্গ টেনে গভর্নর বলেন, দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে। খেলাপি কমানো ছাড়া সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। খেলাপি ঋণ কমলে ব্যাংকগুলোর তারল্য বাড়বে, ঋণের সুদহার স্বাভাবিকভাবেই স্থিতিশীল হবে এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে।

অনুষ্ঠানে আলোচনায় উঠে আসে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। গভর্নর বলেন, এলডিসি সুবিধা কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থায়নে কিছু চাপ তৈরি হবে, তবে শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা থাকলে সেই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব। এজন্য এখনই আর্থিক খাতকে সংস্কারের পথে নিতে হবে।

আলোচনা সভায় ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট একে আজাদ আর্থিক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমেছে, অথচ সরকারের ঋণ বেড়েছে। শুধুমাত্র কঠোর মুদ্রানীতি দিয়ে আর্থিক খাত পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।”

একেআজাদের মতে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে সুদের হার, করনীতি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ—সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় দরকার। শুধু সুদ বাড়িয়ে বা টাকা সরবরাহ কমিয়ে অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনা যাবে না। তাঁর বক্তব্যে ব্যবসায়ী মহলের দীর্ঘদিনের দাবি ও উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, গভর্নরের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন বাজারভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত নীতির দিকে এগোতে চায়। নয়-ছয়ের সুদের হার নীতি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ও বিতর্কিত ছিল। অনেক অর্থনীতিবিদই মনে করেন, এই নীতি ব্যাংকিং খাতে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করেছে এবং ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

গভর্নরের বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর বিষয়টি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংক খাত নিয়ে নানা অনিশ্চয়তার কারণে সাধারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছেন। সুস্থ ও স্বচ্ছ নীতি গ্রহণের মাধ্যমে যদি সেই আস্থা ফেরানো যায়, তাহলে অর্থনীতিতে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে, এই আলোচনা সভা থেকে স্পষ্ট বার্তা এসেছে—বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতকে আর পুরোনো কৃত্রিম নীতিতে চালানো যাবে না। বাস্তবতা মেনে বাজারভিত্তিক সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই সামনে এগোতে হবে। নয়-ছয়ের সুদের হার অধ্যায় কার্যত অতীতের বিষয় হয়ে যাচ্ছে—এমন ইঙ্গিতই দিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত