শীতকালীন ঝড়ে বিপর্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র, প্রাণহানি বেড়ে ৩০

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১৬ বার
যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ শীতকালীন ঝড় বিপর্যয়

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী শীতকালীন ঝড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। তীব্র তুষারপাত, হিমাঙ্কের নিচে নেমে যাওয়া তাপমাত্রা ও বরফাচ্ছন্ন সড়কের কারণে দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৩০ জনের। লাখ লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, বন্ধ হয়ে গেছে স্কুল, অফিস ও সরকারি কার্যক্রম। একই সঙ্গে বাতিল করা হয়েছে ১১ হাজারের বেশি ফ্লাইট, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কার্যত স্থবির করে দিয়েছে।

ওহাইও ভ্যালি, মিড-সাউথ ও নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলজুড়ে আঘাত হানা এই ভয়াবহ শীতকালীন ঝড় যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলের বড় একটি অংশকে কার্যত অচল করে দেয়। নিউইয়র্ক থেকে শুরু করে টেক্সাস পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় প্রবল তুষারপাত ও তীব্র ঠান্ডা জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় জীবনযাত্রা হয়ে পড়েছে ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রাণহানির ঘটনাগুলো সবচেয়ে বেশি ঘটেছে নিউইয়র্ক, টেনেসি, লুইজিয়ানা, ম্যাসাচুসেটস, কানসাস, পেনসিলভানিয়া ও টেক্সাসে। নিউইয়র্ক সিটি হলের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে, শহরটিতে একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকজন বরফ পরিষ্কারের সময় অতিরিক্ত ঠান্ডায় অসুস্থ হয়ে প্রাণ হারান। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়া এবং হাইপোথার্মিয়ার কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি এ ধরনের দুর্যোগে বেড়ে যায়।

টেনেসি ও লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। সেখানে একদিকে প্রবল তুষারপাত, অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক পরিবার দিনের পর দিন বিদ্যুৎ ও গরমের ব্যবস্থা ছাড়া থাকতে বাধ্য হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় পানি সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে, কারণ পাইপলাইনে বরফ জমে ফেটে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় এই ঝড় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে একই সময়ে লাখ লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন। বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে মেরামতকাজে বিলম্ব হচ্ছে। অনেক স্থানে ভেঙে পড়া গাছ ও বরফে ঢাকা বিদ্যুৎ লাইনের কারণে দ্রুত সংযোগ পুনঃস্থাপন সম্ভব হয়নি। তবে জরুরি সেবা ও হাসপাতালগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে জরুরি ওয়ার্মিং সেন্টার খোলা হয়েছে। বয়স্ক, শিশু ও গৃহহীনদের জন্য বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে খাবার, কম্বল ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ করছে। অনেক শহরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গিয়ে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিচ্ছেন।

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, শহরের রাস্তাঘাট সচল রাখতে পাঁচ হাজারের বেশি স্যানিটেশন কর্মী এবং আড়াই হাজার যন্ত্রপাতি মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, শহরের সব প্রধান সড়ক পরিষ্কার করা হয়েছে এবং জরুরি যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে তিনি আরও একদিন অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার জন্য নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান, কারণ তাপমাত্রা এখনও বিপজ্জনক মাত্রায় রয়েছে।

বিমান চলাচলেও এই ঝড়ের প্রভাব ছিল ভয়াবহ। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ১১ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার যাত্রী বিমানবন্দরেই আটকে পড়েন। নিউইয়র্ক, বোস্টন, শিকাগো ও ডালাসের মতো বড় বিমানবন্দরগুলোতে দীর্ঘ বিলম্ব ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। অনেক যাত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, হোটেল ও খাবারের সংকটে তারা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই শীতকালীন ঝড় শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতিই নয়, বরং অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকায় আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে। কৃষি খাতেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, কারণ তীব্র ঠান্ডায় ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ কানাডাতেও একই ধরনের শৈত্যপ্রবাহ ও তুষারঝড় আঘাত হেনেছে। স্থানীয় সময় রোববার কানাডার বড় একটি অংশে তীব্র তুষারপাত শুরু হয়, যা বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সড়ক যোগাযোগে মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। পরিবেশ দফতর পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি করে।

পূর্বাঞ্চলীয় অন্টারিও প্রদেশে টানা ১০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তুষারপাত হয়। রাজধানী অটোয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয় সরকার দিনের বেলায় গাড়ি পার্কিং নিষিদ্ধ করে, যাতে দ্রুত বরফ পরিষ্কারের কাজ করা যায়। দেশটির সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দর টরন্টো পিয়ারসন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টেও বহু ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বিত হয়, যার প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচলে।

আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আগের তুলনায় আরও ঘনঘন ও তীব্র হচ্ছে। শীতকালীন ঝড়গুলো এখন শুধু ঠান্ডা নয়, বরং তুষারপাত, বরফঝড় ও আকস্মিক তাপমাত্রা পতনের সমন্বয়ে আরও বিপজ্জনক রূপ নিচ্ছে। তারা সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির জন্য শহর ও অবকাঠামোকে আরও প্রস্তুত করা প্রয়োজন।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঝড় সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর। গৃহহীন মানুষ, স্বল্প আয়ের পরিবার এবং একাকী বয়স্কদের জন্য এই ঠান্ডা জীবন-মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক জায়গায় স্বেচ্ছাসেবীরা রাতভর কাজ করে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দিচ্ছেন।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় আঘাত হানা এই শীতকালীন ঝড় আবারও দেখিয়ে দিল প্রকৃতির সামনে মানুষের সীমাবদ্ধতা। প্রশাসনের তৎপরতা ও নাগরিকদের সচেতনতা থাকলেও, চরম আবহাওয়ার ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি এড়ানো কঠিন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ততদিন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ জনগণকে সতর্ক থাকার, অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার এবং জরুরি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত