প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
উত্তর কোরিয়া সাগরের দিকে একটি ‘অজ্ঞাত’ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। পিয়ংইয়ংয়ের এই সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা কোরীয় উপদ্বীপে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে চলতি মাসেই এটি উত্তর কোরিয়ার দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূল থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয়। উৎক্ষেপণের পরপরই দক্ষিণ কোরিয়া ও তার মিত্র দেশগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শুরু করে। মন্ত্রণালয় জানায়, ক্ষেপণাস্ত্রটির ধরন ও সক্ষমতা যাচাইয়ের কাজ চলছে এবং প্রয়োজনীয় সব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে এটিকে ‘অজ্ঞাত’ ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ এর প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এই ঘটনার পর জাপানের কোস্ট গার্ডও সতর্কতা জারি করে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাতে জাপানের কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, তারা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে এবং ধারণা করা হচ্ছে, সেগুলো ইতোমধ্যে সাগরে পতিত হয়েছে। জাপানের বার্তা সংস্থা জিজি প্রেস প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র দুটি জাপানের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন বা ইইজেড-এর বাইরে গিয়ে পড়ে। ফলে জাপানের ভূখণ্ড বা সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি কোনো প্রভাব পড়েনি বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সময় ও প্রেক্ষাপট নিয়ে বিশ্লেষকরা আলাদা করে গুরুত্ব দিচ্ছেন। চলতি মাসের শুরুতেই উত্তর কোরিয়া একযোগে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল, যা ঘটে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের চীনে একটি শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে রওনা হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে। তখনই ধারণা করা হয়েছিল, আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের বার্তা দিতেই এই পরীক্ষা চালিয়েছে পিয়ংইয়ং। নতুন এই উৎক্ষেপণ সেই ধারাবাহিকতারই অংশ বলে মনে করছেন অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বাড়িয়েছে। বিভিন্ন ধরনের স্বল্প ও মধ্যপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, এমনকি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের (আইসিবিএম) পরীক্ষাও চালিয়েছে দেশটি। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো নিখুঁত আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়ানো, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা অর্জন করা। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
কোরীয় উপদ্বীপে এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে নানা ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়ে আসছে, যা উত্তর কোরিয়া বরাবরই নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে দাবি করে। পিয়ংইয়ংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব মহড়ার জবাব হিসেবেই তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব মহড়া সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং উত্তর কোরিয়ার আগ্রাসী আচরণ ঠেকানোর জন্যই প্রয়োজন।
এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া একযোগে তথ্য আদান-প্রদান করে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের কথা জানানো হয়েছে। ওয়াশিংটন বরাবরের মতোই উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাকে জাতিসংঘের প্রস্তাব লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং পিয়ংইয়ংকে উত্তেজনা বাড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার সামরিক কর্মকাণ্ডের আরেকটি দিক নিয়েও আলোচনা হচ্ছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, পিয়ংইয়ং কেবল আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের উদ্দেশেই নয়, বরং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অংশ হিসেবেও এই পরীক্ষাগুলো চালাচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অস্ত্র রফতানি ও সামরিক সহযোগিতা নিয়ে উত্তর কোরিয়ার ভূমিকা নিয়ে নানা জল্পনা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সম্ভাব্য রফতানির আগে নিজেদের অস্ত্রের কার্যকারিতা যাচাই করতেই এমন ধারাবাহিক পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের উদ্বেগও বাড়ছে। কোরীয় উপদ্বীপে বসবাসকারী মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই সামরিক উত্তেজনার মধ্যে জীবনযাপন করছে। প্রতিবার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের খবর এলেই সীমান্তবর্তী এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়, স্কুল ও অফিসে জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হয়। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষেপণাস্ত্র সাগরে পতিত হয়, তবুও অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক সংলাপ ছাড়া এই উত্তেজনার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সরাসরি আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী ফল বয়ে আনতে পারেনি। বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল বাস্তবতায় নতুন করে সংলাপ শুরু করা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। তবুও শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে কূটনৈতিক পথই একমাত্র কার্যকর সমাধান বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
সব মিলিয়ে, উত্তর কোরিয়ার ‘অজ্ঞাত’ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনার পারদ আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি শুধু সামরিক শক্তি প্রদর্শনের ঘটনা নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি বিষয়। আগামী দিনে পিয়ংইয়ংয়ের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।