প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের শিল্প খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ শিল্প উদ্যোক্তা ও হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ। শিল্পায়নের গতি কমে যাওয়া, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া এবং ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির কারণে দেশের অর্থনীতি এক কঠিন সময় পার করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শিল্প খাতে মন্দার প্রভাবে ইতোমধ্যে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে, যা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুতর সতর্কসংকেত।
শনিবার সকালে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৫’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এ কে আজাদ বলেন, শিল্প খাত সবসময়ই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি আয় এবং কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শিল্পায়নের গতি মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় সেই ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমবাজারে, যেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিবছর দেশে গড়ে অন্তত ৩০ লাখ নতুন মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হলে বেকারত্ব অনিবার্যভাবে বাড়বে। শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ ও নতুন কারখানা স্থাপনের প্রবণতা কমে যাওয়ায় এসব নতুন শ্রমশক্তির জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে একদিকে যেমন নতুন বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প খাতে সংকোচনের কারণে বিদ্যমান কর্মীরাও চাকরি হারাচ্ছেন।
এ কে আজাদ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী গত অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ। তবে চলতি অর্থবছরে তা কমে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তার মতে, প্রবৃদ্ধির এই নিম্নমুখী ধারা কেবল পরিসংখ্যানগত বিষয় নয়; এটি অর্থনীতির ভেতরে জমে ওঠা চাপ ও কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
তিনি বলেন, শিল্প উৎপাদন কমে গেলে তার প্রভাব পড়ে রাজস্ব আদায়, রপ্তানি আয় এবং ভোক্তা ব্যয়ের ওপর। এসব খাতে ধীরগতি তৈরি হলে সামগ্রিক অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়ে। বিশেষ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলার সংকট এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো শিল্প খাতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
শুধু শিল্প খাত নয়, ব্যাংকিং খাতের অবস্থাও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন এ কে আজাদ। তার মতে, বর্তমানে দেশে খেলাপি বা শ্রেণীকৃত ঋণের হার প্রায় ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান এ হার কিছুটা কম দেখাতে পারে, বাস্তবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেশি বলে তিনি মনে করেন। খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট বাড়ে এবং নতুন বিনিয়োগে ঋণ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যা সরাসরি শিল্প খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ফলে সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় শিল্প উদ্যোক্তারা পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী ঋণ পাচ্ছেন না। এ কে আজাদের ভাষায়, ‘আমরা মাত্র ৬ শতাংশ হারে ঋণ পাচ্ছি, যা শিল্প খাতের জন্য যথেষ্ট নয়।’ উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগের খরচ বাড়িয়ে দেয়, ফলে অনেক উদ্যোক্তা নতুন শিল্প স্থাপন বা বিদ্যমান শিল্প সম্প্রসারণ থেকে পিছিয়ে আসছেন।
তিনি আরও বলেন, দেশের শিল্পায়নের গতি এখন এমন পর্যায়ে নেমে এসেছে যে ব্যবসা ও বাণিজ্যের প্রয়োজনেই নতুন শিল্প গড়ে উঠছে না। শিল্প খাতে স্থবিরতার একটি বড় প্রমাণ হলো ক্যাপিটাল মেশিনারি বা শিল্পযন্ত্র আমদানির পরিসংখ্যান। গত বছর দেশে ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি কমেছিল, আর চলতি বছর তা আগের বছরের তুলনায় আরও ২৬ শতাংশ কমেছে। এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে শিল্প উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন বা বিনিয়োগের সক্ষমতা পাচ্ছেন না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্প খাতে বিনিয়োগ কমে গেলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শ্রমঘন শিল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। কিন্তু শিল্পায়নের গতি কমে গেলে সেই মডেলও চাপে পড়ে। ফলে সামাজিক বৈষম্য বাড়ার পাশাপাশি দারিদ্র্য হ্রাসের অগ্রগতিও ব্যাহত হতে পারে।
এ কে আজাদ তার বক্তব্যে নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তার মতে, মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে শিল্প উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি।
সম্মেলনে উপস্থিত বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধি ও বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এ কে আজাদের বক্তব্য বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতিফলন। শিল্প খাতের দুরবস্থা কেবল উদ্যোক্তাদের সমস্যা নয়; এটি দেশের লাখো শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। চাকরি হারানো মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকলে সামাজিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপ আরও তীব্র হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, শিল্পায়নের নিম্নমুখী প্রবণতা এবং কর্মসংস্থানের সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে এর প্রভাব আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে—এমনই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিল্প খাতের শীর্ষ এই উদ্যোক্তা।