হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধের ছায়া, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা চরমে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬১ বার
হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধের ছায়া, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা চরমে

প্রকাশ: ২৮  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও ঘনিয়ে উঠেছে যুদ্ধের আশঙ্কা। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর আশপাশে আকাশসীমা আংশিকভাবে বন্ধ করে লাইভ-ফায়ার সামরিক মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। এই ঘোষণাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, কারণ হরমুজ প্রণালী শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত।

মঙ্গলবার জারি করা ইরানের নোটিশ টু এয়ারমেন বা এনওটিএএমে জানানো হয়েছে, ২৭ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীর চারপাশে প্রায় পাঁচ নটিক্যাল মাইল ব্যাসার্ধজুড়ে সরাসরি গুলি চালানোর সামরিক মহড়া চালানো হবে। এই সময়ে ভূমি স্তর থেকে শুরু করে ২৫ হাজার ফুট উচ্চতা পর্যন্ত আকাশসীমাকে ‘বিপজ্জনক এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে বাণিজ্যিক ও যাত্রীবাহী বিমান চলাচলে বাড়তি সতর্কতা জারি করা হয়েছে, যা ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক এভিয়েশন খাতে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক করিডোর। প্রতিদিন বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের একটি বিশাল অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন হয়। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো থেকে এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এই প্রণালী কার্যত একটি লাইফলাইন। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তীব্র প্রভাব ফেলতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনার খবর ছড়ালেই তেলের দাম বেড়ে যায় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

ইরানের এই পদক্ষেপকে অনেক বিশ্লেষক সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও যুদ্ধজাহাজ পৌঁছানোর খবর প্রকাশের পরপরই তেহরানের পক্ষ থেকে এ ধরনের ঘোষণা আসা কাকতালীয় নয় বলে মনে করছেন তারা। মার্কিন বিমান বাহিনীও একই সময়ে বিশাল এলাকা জুড়ে প্রস্তুতিমূলক মহড়া ঘোষণার কথা জানিয়েছে, যার উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সক্ষমতা ও উপস্থিতি প্রদর্শন।

ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে মোকাবিলার ক্ষেত্রে সব ধরনের বিকল্প এখনও টেবিলে রয়েছে। এই বক্তব্যে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনার ইঙ্গিত স্পষ্ট, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমানোর কৌশল নিয়ে কাজ করছে। এর আগে ইরানের সঙ্গে টানা ১২ দিনের সংঘাতে ইসরাইলকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তোলে।

অন্যদিকে, ইরানও পাল্টা অবস্থানে অনড়। তেহরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন, যেকোনো ধরনের আক্রমণের জবাবে তারা দ্রুত ও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত। ইরানের দৃষ্টিতে, হরমুজ প্রণালীতে এই মহড়া শুধু সামরিক প্রস্তুতির অংশ নয়, বরং একটি কৌশলগত বার্তা—যার মাধ্যমে তারা দেখাতে চায় যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নে ইরানকে উপেক্ষা করা যাবে না।

এই সামরিক উত্তেজনার পেছনে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও একটি বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কয়েক সপ্তাহ আগে দেশটিতে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপ সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তোলে। সরকার বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিলে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাতে পারে।

এই হুঁশিয়ারির পর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ইরান সরকার বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। তবে এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার অবিশ্বাস কমেনি। বরং উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সামরিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে।

এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরও জোরালো হয়েছে। রয়টার্সকে দেওয়া তথ্যে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ একাধিক গাইডেড-ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী জাহাজ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। এসব জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের অধীনে কাজ করবে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সম্ভাব্য যেকোনো সংঘাতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত থাকবে।

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও রাশিয়াসহ একাধিক দেশ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যদি সামান্য ভুল হিসাবও হয়, তাহলে তা দ্রুত পূর্ণমাত্রার সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, ছড়িয়ে পড়বে গোটা বিশ্বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সংলাপের বিকল্প নেই। সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে চাপ সৃষ্টি করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা আরও অস্থিতিশীলতা ডেকে আনতে পারে। হরমুজ প্রণালীতে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি বড় অংশকে স্থিতিশীল রাখা।

সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালী এখন শুধু একটি জলপথ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শক্তি প্রদর্শনের এক স্পর্শকাতর মঞ্চে পরিণত হয়েছে। আকাশসীমা বন্ধ, লাইভ-ফায়ার মহড়া, যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার পারদ দ্রুত চড়ছে। এই উত্তেজনা কোথায় গিয়ে থামবে, নাকি নতুন কোনো সংঘাতের দিকে এগোবে—তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, এই অঞ্চলের প্রতিটি পদক্ষেপ গভীরভাবে নজরে রাখছে গোটা বিশ্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত