বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে ইতিহাস, ছুঁলো ৫২০০ ডলারের মাইলফলক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৮ বার
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে ইতিহাস, ছুঁলো ৫২০০ ডলারের মাইলফলক

প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের প্রতি ঝোঁক আরও জোরালো হওয়ায় ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে স্বর্ণের বাজার। আন্তর্জাতিক বাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকা স্বর্ণের দাম প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স ৫ হাজার ২০০ ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের ধারণা—অনিশ্চিত সময়ে স্বর্ণই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়—এই রেকর্ড দামের মাধ্যমে আবারও বাস্তবে প্রমাণিত হলো।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বুধবার (২৮ জানুয়ারি) স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৫ হাজার ২১৯ দশমিক ৯৭ ডলারে পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে আগের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন সর্বোচ্চ দামে লেনদেন শুরু হয়েছে। এর আগে স্বর্ণের সর্বকালের সর্বোচ্চ দাম ছিল এর চেয়ে অনেক নিচে, যা বাজার বিশ্লেষকদের কাছেও ছিল একসময় কল্পনাতীত।

চলতি বছরের শুরু থেকেই স্বর্ণের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে স্বর্ণের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে, যা বৈশ্বিক বিনিয়োগ বাজারে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শুধু স্পট মার্কেট নয়, ফিউচার মার্কেটেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে ডেলিভারির জন্য মার্কিন স্বর্ণের ফিউচার ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৫ হাজার ২১৬ দশমিক ৮০ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতেও স্বর্ণের দাম আরও বাড়বে—এমন প্রত্যাশা নিয়েই বাজারে অবস্থান নিচ্ছেন।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে মার্কিন ডলারের দুর্বলতা। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের মুদ্রানীতির সিদ্ধান্তকে ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ডলারের মান চার বছরের মধ্যে প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ডলার দুর্বল হলে স্বাভাবিকভাবেই স্বর্ণের দাম বাড়ে, কারণ তখন অন্যান্য মুদ্রার বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণ তুলনামূলকভাবে সস্তা ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মঙ্গলবার একদিনেই স্বর্ণের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। এর ধারাবাহিকতায় বুধবার প্রথমবারের মতো ৫ হাজার ২০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করে মূল্যবান এই ধাতু। এই দ্রুত উত্থান বাজারে এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি করেছে, যেখানে কেউ কেউ এটিকে স্বর্ণের নতুন ‘সুপার সাইকেল’-এর সূচনা হিসেবে দেখছেন।

সিনিয়র বাজার বিশ্লেষক কেলভিন ওং মনে করেন, ডলারের দুর্বলতাই স্বর্ণের এই রেকর্ড দামের প্রধান চালিকাশক্তি। তার ভাষায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর বাজারে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে ভবিষ্যতে ডলারের মূল্য আরও কমতে পারে। হোয়াইট হাউসের ভেতরেও নাকি এই ভাবনাই প্রাধান্য পাচ্ছে। এই প্রত্যাশা স্বর্ণের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিমুক্ত সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে আরও বেশি ঝুঁকছেন।

চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকা ডলার বিনিয়োগকারীদের আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। যারা আগে শেয়ারবাজার বা ডলারভিত্তিক সম্পদে বিনিয়োগ করতেন, তারাও এখন স্বর্ণের দিকে নজর দিচ্ছেন। ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, ডলারের মূল্য বর্তমানে ‘অনেক বেশি’ এবং শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হবে। বাজারের ধারণা, নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর সুদের হার কমানোর পথে হাঁটতে পারেন। সুদের হার কমলে ডলারের আকর্ষণ কমে যায় এবং স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদের চাহিদা বাড়ে।

যদিও জানুয়ারির মুদ্রানীতি সভায় সুদের হার স্থিতিশীল রাখার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে, তবুও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা স্বর্ণের বাজারকে আরও চাঙ্গা করছে। কেলভিন ওং আশাবাদী কণ্ঠে জানান, খুব শিগগিরই স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ২৪০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। তার মতে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসেও স্বর্ণের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখা যাচ্ছে। জার্মানির শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডয়চে ব্যাংক মনে করছে, ২০২৬ সালের মধ্যেই স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৬ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে। ব্যাংকটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে ডলারনির্ভর সম্পদ থেকে সরে এসে বাস্তব ও স্পর্শযোগ্য সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে স্বর্ণের দাম আরও নতুন উচ্চতায় পৌঁছানো অস্বাভাবিক কিছু নয়।

স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্পট সিলভারের দাম শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ১১৩ দশমিক ৬৩ ডলারে পৌঁছেছে, যা চলতি বছরের শুরু থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে প্লাটিনামের দাম ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ২ হাজার ৬৭৯ দশমিক ১৫ ডলার এবং প্যালাডিয়ামের দাম শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৯৫১ দশমিক ৯৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই চিত্র স্পষ্ট করে যে শুধু স্বর্ণ নয়, নিরাপদ ও শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত অন্যান্য ধাতুর প্রতিও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ডলারের দুর্বলতা, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপকে ঘিরে ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিশ্ব অর্থনীতির ধীরগতির আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিমুক্ত সম্পদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। স্বর্ণ সেই চিরাচরিত নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে আবারও তার অবস্থান শক্ত করছে। ইতিহাস বলছে, বড় অর্থনৈতিক সংকট বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় স্বর্ণের দাম বাড়ে, আর বর্তমান পরিস্থিতি সেই ধারাবাহিকতারই নতুন অধ্যায়।

সব মিলিয়ে, ৫ হাজার ২০০ ডলারের মাইলফলক শুধু একটি সংখ্যাগত রেকর্ড নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির গভীর অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগকারীদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। সামনে ফেডারেল রিজার্ভের নীতি, ডলারের গতিপথ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করবে স্বর্ণের পরবর্তী গন্তব্য। তবে আপাতত একথা বলা যায়, স্বর্ণ আবারও প্রমাণ করেছে—ঝড়ের সময় শেষ ভরসা হিসেবেই সে বিনিয়োগকারীদের কাছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত