মসজিদুল হারাম ও নববীতে রমজানেও ১০ রাকাত তারাবি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৬ বার
মসজিদুল হারাম ও নববীতে রমজানেও ১০ রাকাত তারাবি

প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রমজান এলেই মুসলিম বিশ্বের হৃদয়ে নতুন এক আবেশ নেমে আসে। ইবাদত, সংযম, আত্মশুদ্ধি আর আল্লাহর নৈকট্য লাভের আকাঙ্ক্ষায় মুমিনরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন বহু আগে থেকেই। এই পবিত্র মাসের রাতগুলোকে আলোকিত করে যে ইবাদতটি, সেটি হলো তারাবিহ নামাজ। রমজান ২০২৬ বা ১৪৪৭ হিজরি উপলক্ষে মুসলিম বিশ্বের দুই সর্বাপেক্ষা পবিত্র স্থান—মক্কার মসজিদুল হারাম ও মদিনার মসজিদে নববীতে তারাবিহ নামাজের নিয়ম এবারও অপরিবর্তিত থাকছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ বছরও সেখানে তারাবিহ আদায় করা হবে ১০ রাকাত এবং এর পর ৩ রাকাত বিতর নামাজ।

দুই পবিত্র মসজিদের বিষয়ক জেনারেল প্রেসিডেন্সি এই সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছে। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আসন্ন রমজানে রাতের তারাবিহ নামাজ নির্ধারিত এই কাঠামো অনুসারেই আদায় করা হবে। অর্থাৎ, প্রতিদিন তারাবিহ ও বিতর মিলিয়ে মোট ১৩ রাকাত নামাজ আদায় হবে এবং পাঁচবার সালাম ফিরানো হবে, যার শেষটি হবে বিতর নামাজের সালাম। কর্তৃপক্ষের এই ঘোষণা মুসলিম বিশ্বজুড়ে আগ্রহ ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর নামাজের ধারা বহু মুসলমানের জন্য অনুসরণীয় ও প্রভাববিস্তারকারী।

মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর তারাবিহ নামাজ শুধু স্থানীয় মুসল্লিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে প্রতিদিন এই নামাজ বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে অনুসরণ করেন। ঘরে বসেই তারা পবিত্র কাবা কিংবা রওজা শরিফের সামনে দাঁড়িয়ে ইমামদের কিরাআত শুনে আত্মিক প্রশান্তি লাভ করেন। তাই এই দুই মসজিদে তারাবিহ নামাজের রাকাত সংখ্যা ও পদ্ধতি নিয়ে মুসলিমদের আবেগ ও আগ্রহ বরাবরই বেশি।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রমজান শুরু হওয়ার কাছাকাছি সময়ে তারাবিহ নামাজের সময়সূচি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমামদের তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। সাধারণত অভিজ্ঞ ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতনামা ক্বারিরাই এই দায়িত্ব পালন করে থাকেন, যাদের কণ্ঠে দীর্ঘ ও সুললিত তিলাওয়াত মুসল্লিদের হৃদয় স্পর্শ করে।

ঐতিহাসিকভাবে তারাবিহ নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে মুসলিম সমাজে আলোচনা ও মতভেদ থাকলেও এর মূল উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে তারাবিহ নামাজ জামাতের সঙ্গে নিয়মিতভাবে কায়েম করা হয়। সাহাবায়ে কেরামের যুগে ২০ রাকাত তারাবিহ আদায়ের প্রচলন সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং বহু সহিহ ঐতিহাসিক বর্ণনায় ২০ রাকাতের কথা পাওয়া যায়। দীর্ঘ সময় ধরে মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীতেও ২০ রাকাত তারাবিহ আদায়ের রেওয়াজ চালু ছিল।

তবে করোনাভাইরাস মহামারির সময় পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে যায়। মুসল্লিদের ভিড় নিয়ন্ত্রণ, সময় সংক্ষিপ্ত করা এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার সুবিধার কথা বিবেচনা করে তখন তারাবিহ নামাজ ১০ রাকাতে সীমিত করা হয়। সে সময় কর্তৃপক্ষ এটিকে একটি সাময়িক সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, ১০ রাকাতে দীর্ঘ কিরাআত ও তিলাওয়াতভিত্তিক নামাজ মুসল্লিদের মধ্যে গভীর মনোযোগ ও খুশু সৃষ্টি করছে। অনেক মুসল্লি অনুভব করেন, কম রাকাত হলেও দীর্ঘ তিলাওয়াতের মাধ্যমে কোরআনের সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগ আরও দৃঢ় হচ্ছে।

এ ছাড়া কর্তৃপক্ষের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয় ছিল ওমরাহ পালনকারীদের সুবিধা। রমজান মাসে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মুসলমান ওমরাহ আদায়ের জন্য মক্কায় আসেন। তারাবিহ নামাজ দীর্ঘ হলে অনেকের জন্য ওয়াজিব তাওয়াফ আদায় করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। ১০ রাকাত তারাবিহ চালু থাকায় সময়ের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং ব্যবস্থাপনাগত দিক থেকেও বিষয়টি সহজ হয় বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এসব অভিজ্ঞতার আলোকে তারা ১০ রাকাত তারাবিহের পদ্ধতিকে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তারাবিহ নামাজ রমজানুল মুবারকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিআর বা প্রতীক। ইশার নামাজের পর বিতরের আগে এই নামাজ আদায় করা হয় এবং এটি নারী-পুরুষ সকলের জন্য সুন্নত। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে নিয়মিত তারাবিহ নামাজ আদায় করেছেন এবং সাহাবিদেরও এতে উৎসাহিত করেছেন। যদিও তিনি ফরজ হওয়ার আশঙ্কায় নিয়মিত জামাতের সঙ্গে তা আদায় করেননি, তবু তাঁর শিক্ষা ও আমল থেকেই তারাবিহ নামাজের গুরুত্ব মুসলিম উম্মাহর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

হাদিস শরিফে তারাবিহ ও রমজানের রাতের ইবাদতের ফজিলত অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে ইবাদত করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” আলেমদের ব্যাখ্যায় জানা যায়, এখানে মূলত সগিরা গুনাহ মাফের কথা বলা হয়েছে; আর কবিরা গুনাহের জন্য খাঁটি তাওবা আবশ্যক।

তারাবিহ নামাজ সর্বপ্রথম চালু করেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। ইবনে কুদামা রহ. তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-মুগনি-তে উল্লেখ করেছেন, তারাবিহ নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদা এবং এর সূচনা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতেই। একাধিক হাদিসে বর্ণিত আছে, তিনি রমজানের কয়েকটি রাতে মসজিদে গিয়ে সাহাবিদের নিয়ে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করেছিলেন। পরে ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি তা নিয়মিত করেননি।

হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, এক রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে নামাজে দাঁড়ালে কিছু সাহাবি তাঁর পেছনে নামাজ আদায় করেন। পরের রাতে লোকসংখ্যা বেড়ে যায়। তৃতীয় বা চতুর্থ রাতে সাহাবিরা অপেক্ষা করলেও তিনি বের হননি। পরে তিনি বলেন, তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে, এই নামাজ ফরজ করে দেওয়া হতে পারে। এই বর্ণনা থেকেই বোঝা যায়, তারাবিহ নামাজের মূল শিক্ষা হলো স্বতঃস্ফূর্ত ইবাদত, যা আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি বিশেষ মাধ্যম।

সব মিলিয়ে, রমজান ২০২৬-এ মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীতে ১০ রাকাত তারাবিহ আদায়ের সিদ্ধান্ত মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। এটি প্রমাণ করে, ইবাদতের মূল সৌন্দর্য রাকাতের সংখ্যায় নয়; বরং খুশু, একাগ্রতা ও আন্তরিকতায়। পবিত্র এই মাসে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান এই দুই মসজিদের নামাজের সঙ্গে আত্মিকভাবে যুক্ত হয়ে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতের আশায় রাত জাগাবেন—এটাই রমজানের প্রকৃত সৌন্দর্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত